সাতটি কুখ্যাত জাদুর বইয়ের কথা
ইতিহাসের পাতায় নজর দিলে দেখা যায়, মানুষ সবসময়ই বিশ্বাস করে এসেছে যে এমন কিছু
গোপন বা নিষিদ্ধ জ্ঞান আছে, যা আয়ত্ত করতে পারলে বাস্তব জগতকে নিয়ন্ত্রন করা
সম্ভব হবে। এই ধারনা থেকেই রহস্যময় সব জাদুর বইয়ের উৎপত্তি হয়েছে। এসব বইয়ে সাধারণত অলৌকিক শক্তি লাভের মন্ত্র, বিশেষ
আচার-অনুষ্ঠান এবং মহাবিশ্বের গোপন রহস্যের কথা লেখা থাকে। বর্তমান যুগে অনেকে
এগুলোকে কল্প কাহিনী বলে উড়িয়ে দিলেও, কিছু বইয়ের প্রেক্ষাপট এতটাই অদ্ভুত এবং
সেগুলোর ইতিহাস এতটাই গা ছমছমে যে, সেগুলো নিয়ে মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই।
এই প্রবন্ধে আমরা বাস্তব জগতের এমন সাতটি কুখ্যাত জাদুর বই নিয়ে আলোচনা করব, যা
ইতিহাসজুড়ে মানুষকে বিষ্মিত করেছে। বিশেষ করে, এই বইগুলোর পেছনের সেই সব রহস্যময়
দিকগুলো তুলে ধরা হয়েছে, যা এদেরকে সাধারণ বইয়ের গণ্ডি ছাড়িয়ে এক একটি জীবন্ত
কিংবদন্তিতে পরিণত করেছে।
সূচিপত্রঃ সাতটি কুখ্যাত জাদুর বইয়ের কথা
- দ্য নেক্রোনমিকন (The Necronomicon)
- দ্য কি অফ সলোমন (The Key of Solomon)
- দ্য লেসার কি অফ সলোমন (The Lesser Key of Solomon)
- দ্য পিকাট্রিক্স (The Picatrix)
- দ্য বুক অফ আব্রামেলিন (The Book of Abremelin)
- দ্য ভয়নিচ ম্যানুস্ক্রিপ্ট (The Voynich Manuscript)
- দ্য সিক্সথ অ্যান্ড সেভেন্থ বুকস অফ মোজেস (The Sixth and Seventh Books of Moses)
- শেষ কথা
দ্য নেক্রোনমিকন (The Necronomicon)
যেকোনো জাদুর বই নিয়ে আলোচনা করতে গেলে সবার আগে
দ্য নেক্রোনোমিকন
(The Necronomicon)-এর নাম চলে আসে। মজার ব্যাপার হলো, এই বইটির জন্ম হয়েছিল
প্রখ্যাত ভৌতিক লেখক এইচ. পি. লাভক্রাফটের কল্পনা থেকে। তার
কসমিক হরর গল্পগুলোর প্রয়োজনে তিনি এই নিষিদ্ধ বইটির অবতারণা
করেছিলেন।
লাভক্রাফটের গল্পগুলোতে এই বইটিকে একটি নিষিদ্ধ গ্রিমোয়ার (Grimoire) বা
কালো জাদুর বই হিসেবে দেখানো হয়েছে। তার বর্ননা অনুযায়ী, বইটি তার সৃষ্টি করা
কাল্পনিক চরিত্র আব্দুল আলহাজরেদ (যাকে পাগল আরব (Mad Arab) বলেও ডাকা হয়ে থাকে) লিখেছেন; যেখানে প্রাচীন এবং রহস্যময় সব অশুভ শক্তিকে বশ করার বা ডাকার ভয়ঙ্কর
সব আচার অনুষ্ঠানের কথা বলা হয়েছে।
এটি লেখকের নিছক একটি কাল্পনিক সৃষ্টি হয়ে থাকলেও, গল্পগুলোতে এর রহস্যময় বর্ণনা
আর ভয়ঙ্কর খ্যাতি একে এতটাই বাস্তব রূপ দিয়েছে যে, এটি সাহিত্য ছাড়িয়ে এক নিজস্ব
কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছে। অনেকেই আজও বিশ্বাস করেন যে বাস্তবেও এই বইটির অস্তিত্ব
আছে।
বইটির রহস্য আরও ঘনীভূত হওয়ার পেছনে মূল কারণ হলো যে অনেকেই জোরালোভাবে দাবি করেন
যে দ্য নেক্রোনোমিকন কেবল গল্প নয়, বরং কোনো না কোনো রূপে বাস্তবে এর
অস্তিত্ব রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে বাজারে এই বইটির নানা ধরণের সংস্করণ দেখা
গেছে, যেগুলোর কোনো কোনোটিকে আবার প্রাচীন মূল পাণ্ডুলিপির প্রকৃত অনুবাদ হিসেবে
প্রচার করা হয়েছে।
এমনকি অনেক গবেষক ও গুপ্তবিদ্যা বিশেষজ্ঞ (Occultist) মনে করেন, এইচ. পি.
লাভক্রাফট হয়তো অবচেতনভাবে কোনো প্রাচীন লোকগাথা বা ঐতিহ্যের ছায়া নিয়ে বইটি
লিখেছিলেন। তারা মনে করেন যে লাভক্রাফট সম্ভবত মেসোপটেমীয় সভ্যতার (বর্তমানের ইরাক) হারিয়ে যাওয়া কোনো পৌরাণিক কাহিনী থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন, যা বইটিকে এক
ধরণের ঐতিহাসিক সত্যতা দেওয়ার চেষ্টা করে। মূলত বাস্তব ও কল্পনার এই অদ্ভুত
সংমিশ্রণই বইটিকে ঘিরে থাকা রহস্যকে আজ অবধি টিকিয়ে রেখেছে।
সবচেয়ে অস্বস্তিকর বিষয় হলো এই বইটির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব।
যারা এই বইটি পড়েছেন, তারা প্রায়ই এক ধরনের অজানা ও গা ছমছমে আতঙ্কের কথা জানান।
তাদের কাছে এটি কেবল কোন গল্পের বই নয়, বরং অচেনা ও বিশাল কোনো অশুভ জগতের দিকে
খুলে যাওয়া এক রহস্যময় দরজা বলে মনে হয়।
পুরোপুরি কাল্পনিক অথবা প্রাচীন কোন হারিয়ে যাওয়া সভ্যতার ভুলে যাওয়া ঐতিহ্য থেকে
অনুপ্রেরনা পাওয়া, যাই হোক না কেন এই বইটি বর্তমানে একটি বিশেষ সাংস্কৃতিক
প্রতীকে পরিণত হয়েছে। এটি সাহিত্যের গণ্ডি পেরিয়ে এমন এক অবস্থানে পৌঁছেছে যেখানে
কল্পনা আর বাস্তব মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।
দ্য কি অফ সলোমন (The Key of Solomon)
দ্য কি অফ সলোমন
হলো মধ্যযুগ ও রেনেসাঁ সময়ের অন্যতম প্রভাবশালী এক জাদুর বই। লোকমুখে প্রচলিত আছে
যে এই বই ইহুদি বাইবেলে উল্লেখ করা প্রাচীন ইসরায়েলের রাজা সলোমন নিজ হাতে
লিখেছিলেন, যদিও ঐতিহাসিকরা মনে করেন এটি মূলত তার নাম ব্যবহার করে লেখা একটি
প্রতীকী গ্রন্থ।
এই বইটিতে বিভিন্ন আত্মাকে জাগিয়ে তোলা এবং তাদের নিয়ন্ত্রণ করার বিস্তারিত উপায়
বাতলে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া জাদুকরী সব সরঞ্জাম তৈরির বিশেষ পদ্ধতি এবং মহাজাগতিক
শক্তির সাথে তাল মিলিয়ে কীভাবে নানা আচার-অনুষ্ঠান পালন করতে হয়, তারও
সুনির্দিষ্ট নিয়মাবলি এখানে বর্ণনা করা হয়েছে।
এই বইটির বিশেষত্ব হলো এর নির্দেশনাগুলোর অসাধারণ নির্ভুলতা ও জটিলতা, যা একে আরও
রহস্যময় করে তুলেছে। বইটি কোন পৌরানিক কাহিনী বা রুপক গল্পের মতো লেখা হয়নি; বরং
একে পড়তে অনেকটা কারিগরি নির্দেশিকা বা টেকনিক্যাল ম্যানুয়াল -এর মতো মনে হতে
পারে।
বইটিতে গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান সতর্কভাবে পর্যবেক্ষন করে প্রতিটি জাদুর
অনুষ্ঠানের জন্য নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করা, এবং কঠোরভাবে শরীর ও মন শুদ্ধ করার
নিয়ম বলে দেওয়া হয়েছে। এই ধরণের সূক্ষ্ম নিয়মাবলি এটাই প্রমাণ করে যে, এর
রচয়িতারা এই পদ্ধতির কার্যকারিতার ওপর কতটা গভীর ও অটল বিশ্বাস রাখতেন। মূলত এই
কাঠখোট্টা ও বাস্তবসম্মত ভঙ্গিই বইটিকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করে রেখেছে।
বইটির উৎস বা অরিজিন নিয়ে গড়ে ওঠা বিভিন্ন প্রশ্নগুলো বইটিকে গবেষক এবং সাধক
উভয়ের কাছেই আরও বেশি আকর্ষণীয় করে তুলেছে। গবেষকরা পরীক্ষা করে দেখেছেন যে, এর
বিভিন্ন অংশের সাথে প্রাচীন ইহুদি, গ্রিক এবং আরব জাদুবিদ্যার ঐতিহ্যের মিল
রয়েছে। এটি থেকে বোঝা যায় যে, বইটি কোনো একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তির কাজ নয়; বরং এটি
আসলে প্রাচীনকালের নানা গোপন ও জটিল জ্ঞানের একটি সংকলন।
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে যেসব সাধকেরা জাদুবিদ্যার চর্চা করে এসেছেন, তারা একটি
বিষয়ে বারবার পাঠকদের সতর্ক করে দেন যে, এই বইয়ের বর্নিত আচার-অনুষ্ঠানগুলো
সামান্য ভুলভাবে পালন করলেও মানুষ পাগল হয়ে যেতে পারে অথবা তার জীবনে ভয়াবহ
আধ্যাত্মিক বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। এই ভয়ংকর সতর্কবার্তাগুলো রূপক অর্থে বলা হয়ে
থাকে নাকি সত্যিই কারও বাস্তব অভিজ্ঞতার ফল, তা আজও অজানা রয়ে গেছে। তবে এই
রহস্যময় ভীতিই বইটির অশুভ খ্যাতিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
দ্য লেসার কি অফ সলোমন (The Lesser Key of Solomon)
দ্য লেসার কি অফ সলোমন, যা লেমেগেটন (Lemegeton) নামেও পরিচিত, উপরে উল্লেখ করা বইটির সাথে
গভীরভাবে সম্পর্কিত। তবে কুখ্যাতির দিক থেকে এটি সম্ভবত আরও এক ধাপ এগিয়ে
আছে।
এই বইয়ের প্রথম অংশটি সবচেয়ে বেশি পরিচিত, যার নাম আরস গোয়েটিয়া (Ars
Goetia)। এখানে ৭২টি শক্তিশালী দানবের (Demon) একটি তালিকা দেওয়া হয়েছে।
প্রতিটি দানবের আলাদা আলাদা ক্ষমতা, চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য এবং তারা নরকে শয়তানের
সাম্রাজ্যে কে কোন পদমর্যাদায় অধিষ্ঠিত আছে, তার বিস্তারিত বর্ণনা এই বইয়ে পাওয়া
যায়।
বইটির সবচেয়ে গা ছমছমে দিক হলো দানবদের সম্পর্কে এর অত্যন্ত সুশৃঙ্খল এবং
পদ্ধতিগত বর্ণনা। এখানে প্রতিটি অশুভ সত্তাকে এত প্রাণবন্ত ও বিস্তারিতভাবে
ফুটিয়ে তোলা হয়েছে যে তা রীতিমতো পিলে চমকে দেওয়ার মতো। প্রতিটি দানবের বর্ণনার
সাথে রয়েছে একটি করে সিজিল বা প্রতীকী সীলমোহর। বলা হয়ে থাকে যে, এই বিশেষ
প্রতীকগুলো ব্যবহার করেই কোনো জাদুকর সেই নির্দিষ্ট দানবকে ডেকে আনতে এবং তাকে
নিজের আজ্ঞাবহ করে রাখতে পারেন।
এই বইটির বিন্যাস এতটাই গোছানো ও নিখুঁত যে অনেকেই দ্বিধায় পড়ে যানঃ এটি কি কেবল
মানুষের মনের কোনো জটিল প্রতীকী কল্পনা, নাকি এর পেছনে সত্যিই কোনো ভয়ানক
বাস্তবতা লুকিয়ে আছে? এই সংশয়ই বইটিকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে।
এই রহস্যের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো, বিভিন্ন সময়ের পাণ্ডুলিপি এবং ভিন্ন
ভিন্ন দেশে প্রচলিত বর্ণনাগুলোর মধ্যে থাকা অদ্ভুত মিল। কোনো কেন্দ্রীয়
কর্তৃপক্ষ বা তদারকি না থাকা সত্ত্বেও, কীভাবে শত শত বছর ধরে হাতে লেখা কপিগুলোতে
এই জটিল তথ্যগুলো হুবহু একই রকম রয়ে গেল?
গুপ্ততত্ত্ববিদদের মতে, এই গোপন জ্ঞান সম্ভবত বিভিন্ন রহস্যময় বা
সিক্রেট সোসাইটির মাধ্যমে এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে অত্যন্ত গোপনে
পাচার করা হয়েছে। আবার অনেক গবেষক মনে করেন, এই বর্ণনাগুলো আসলে মানুষের
অবচেতনের কোনো অভিন্ন স্তরের বহিঃপ্রকাশ। কারণ যাই হোক না কেন, এই ধারাবাহিকতা
বইটিকে আজও এক অমীমাংসিত ধাঁধায় পরিণত করে রেখেছে।
বলা হয়ে থাকে, এই বইয়ে বর্নিত আচার-অনুষ্ঠানগুলো পালন করার জন্য প্রচণ্ড
মানসিক শৃঙ্খলা আর অসীম সাহসের প্রয়োজন আছে। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, একবার কোনো
অশরীরী সত্তাকে জাগিয়ে তোলার পর যদি তাকে সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তবে তার
পরিনাম অত্যন্ত ভয়াবহ হতে পারে।
দ্য পিকাট্রিক্স (The Picatrix)
আরবি ভাষায় রচিত ঘায়াত আল-হাকিম (বা জ্ঞানীদের গন্তব্য) একটি
সুবিশাল ও রহস্যময় গ্রন্থ, যা বিশ্বজুড়ে
পিকাট্রিক্স
নামে পরিচিত। এটি এমন এক রহস্যময় বই যেখানে জ্যোতির্বিজ্ঞান, প্রাচীন রসায়ন বা
অ্যালকেমি ও জাদুবিদ্যার গভীর আলোচনা মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। মধ্যযুগে যখন
বইটিকে ল্যাটিন ভাষায় অনুবাদ করা হয়, তখন ইউরোপের গোপন জ্ঞানচর্চা বা
গুপ্তবিদ্যার মহলে এটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায় এবং অত্যন্ত প্রভাবশালী একটি গ্রন্থে
পরিণত হয়।
পিকাট্রিক্স বইটির রহস্যের মূল ভিত্তি হলো এর অনন্য জীবনদর্শন। এই বইটিতে জাদুকে
কোনো অলৌকিক বা অতিপ্রাকৃতিক বিষয় হিসেবে দেখা হয়নি; বরং একে মহাবিশ্বের
স্বাভাবিক নিয়মেরই একটি অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। বইটির মূল তত্ত্ব হলোঃ এই
মহাবিশ্বের প্রতিটি বস্তু ও শক্তির মাঝে এক গভীর এবং অদৃশ্য সম্পর্ক রয়েছে। জাদু
হলো সেই বিশেষ জ্ঞান বা কৌশল, যার মাধ্যমে এই প্রাকৃতিক সংযোগগুলোকে চিনে নিয়ে
সেগুলোকে নিজের প্রয়োজনে ব্যবহার বা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। মূলত জাদুকে একটি
সুশৃঙ্খল বিজ্ঞানের মতো উপস্থাপন করাই এই বইটিকে অনন্য করে তুলেছে।
বইটিতে বর্ণিত আচার-অনুষ্ঠানগুলো যেমন জটিল, তেমনি অদ্ভুত। জাদুর অনুষ্ঠান গুলো
সম্পন্ন করতে একদিকে যেমন অত্যন্ত দুর্লভ সব উপকরণের প্রয়োজন হয়, তেমনি অন্যদিকে
গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থানের মতো সূক্ষ্ম জ্যোতিষীয় বিষয়ের ওপর কড়া নজর দিতে হয়। এর
কিছু কিছু নির্দেশনা বা সংকেত এতই ঘোলাটে এবং অস্পষ্ট যে, বর্তমান যুগের বড় বড়
গবেষকরাও সেগুলোর প্রকৃত অর্থ উদ্ধার করতে গিয়ে হিমশিম খেয়ে যান। মূলত এই
দুর্বোধ্যতাই বইটিকে আরও বেশি রহস্যময় করে তুলেছে।
এই বইটি আসলে কে লিখেছিলেন, তা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে ব্যাপক বিতর্ক রয়েছে। ধারনা
করা হয় যে এই বইটি কোন একক লেখকের কাজ নয়, বরং এটি প্রাচীন গ্রিক, পারসিক এবং
ভারতীয় ঐতিহ্যের বিভিন্ন তথ্যের একটি অসাধারণ সংকলন। জ্ঞান-বিজ্ঞানের এই
বিচিত্র ধারার সংমিশ্রণ প্রমাণ করে যে, সেই প্রাচীনকালেই বিভিন্ন সভ্যতার মধ্যে
এক গভীর ও বিরল বুদ্ধিবৃত্তিক আদান-প্রদান ঘটেছিল।
অসম্ভব জটিল হওয়া সত্ত্বেও, কিংবা হয়তো এই জটিলতার কারণেই, পিকাট্রিক্স আজ অবধি
ইতিহাসের অন্যতম পঠিত এবং বিতর্কিত জাদুবিদ্যা বিষয়ক গ্রন্থ হিসেবে নিজের জায়গা
ধরে রেখেছে।
দ্য বুক অফ আব্রামেলিন (The Book of Abremelin)
প্রথাগত জাদুবিদ্যার বইগুলোর মতো
দ্য বুক অফ আব্রামেলিন
কেবল অলৌকিক শক্তির পেছনে ছোটে না; বরং এটি মানুষের অভ্যন্তরীণ আধ্যাত্মিক
রূপান্তরকে (Spiritual Transformation) বেশি প্রাধান্য দেয়। এই বইটিতে অত্যন্ত
দীর্ঘ ও কঠিন একটি সাধনার কথা বলা হয়েছে, যা শেষ করতে প্রায় ছয় মাস বা তারও বেশি
সময় লাগতে পারে। এই দীর্ঘ সাধনার মূল লক্ষ্য হলোঃ নিজের
পবিত্র অভিভাবক দেবদূত (Holy Guardian Angel)-এর দেখা পাওয়া এবং তাঁর সাথে
সম্পর্ক স্থাপন করা। এই বিশেষ দর্শনই বইটিকে ইতিহাসে অনন্য করে রেখেছে।
এই বইটির আসল রহস্য লুকিয়ে আছে এর কঠোর এবং অত্যন্ত কঠিন নিয়মাবলির মধ্যে। এটি
সাধারণ কোনো মন্ত্রের বই নয়; বরং এটি সফলভাবে পালন করতে হলে একজন মানুষকে
পুরোপুরি একা থাকা, চরম শারীরিক ও মানসিক পবিত্রতা বজায় রাখা এবং ইস্পাতকঠিন
শৃঙ্খলা মেনে চলার সংকল্প নিতে হয়। অনুশীলনকারীদের এই দীর্ঘ সময়ে আরও কিছু
কঠোর নিয়ম মেনে চলতে হয়, যার মধ্যে রয়েছে প্রতিদিন নির্দিষ্ট নিয়মে প্রার্থনা করা
এবং সব ধরনের জাগতিক বিলাসিতা বা মোহ থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ দূরে রাখা।
বইটির সবচেয়ে গা ছমছমে বা অস্বস্তিকর দিকটি হলো এই দীর্ঘ সাধনা শেষ হওয়ার পরের
অংশ। বইটির বর্ননা অনুযায়ী, একজন সাধক যখন সফলভাবে তার অভিভাবক দেবদূত-এর
সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে সক্ষম হন, তখনই তিনি দানবদের ডেকে আনার এবং তাদেরকে
নিজের আজ্ঞাবহ করে রাখার অতিপ্রাকৃতিক ক্ষমতা অর্জন করেন।
একদিকে পবিত্র দেবদূতের আশীর্বাদ আর অন্যদিকে অশুভ দানবীয় শক্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ;
এই দুই বিপরীতমুখী বিষয়ের সহাবস্থান ক্ষমতা এবং নৈতিকতা নিয়ে এক গভীর রহস্যের
জন্ম দেয়। এই দ্বৈত বৈশিষ্ট্যই বইটিকে গবেষক এবং পাঠকদের কাছে অত্যন্ত অস্বস্তিকর
অথচ আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
বইটির আসল উৎস বা লেখক কে, তা নিয়ে আজও অনেক বিতর্ক রয়েছে। বইটিতে দাবী করা হয়েছে
যে, এটি আব্রাহাম অব ওয়ার্মস (Abraham of Worms) নামক এক ব্যক্তির লেখা
প্রাচীন পাণ্ডুলিপির অনুবাদ। তবে ঐতিহাসিকভাবে এই দাবির সপক্ষে তেমন কোনো শক্ত
প্রমাণ পাওয়া যায় না। রহস্যবাদ, ধর্ম এবং গুপ্তবিদ্যার এক অনন্য সংমিশ্রণ ঘটার
কারণে এটি ইতিহাসের অন্যতম জটিল ও তাত্ত্বিক জাদুগ্রন্থে পরিণত হয়েছে।
দ্য ভয়নিচ ম্যানুস্ক্রিপ্ট (The Voynich Manuscript)
অন্যান্য গতানুগতিক জাদুবিদ্যার বই বা গ্রিমোয়ারের চেয়ে
ভয়নিচ ম্যানুস্ক্রিপ্ট বা পান্ডুলিপি কিছুটা আলাদা; একে সরাসরি জাদুর বই বলা যায় না। তবে এর অদ্ভুত গঠন
আর অমীমাংসিত রহস্য অনেককেই এটা বিশ্বাস করতে বাধ্য করেছে যে, এর পাতায় পাতায়
হয়তো প্রাচীন জাদুবিদ্যা কিংবা অ্যালকেমির কোনো গোপন জ্ঞান লুকিয়ে রাখা
হয়েছে।
বিশ শতকের শুরুর দিকে আবিস্কার হওয়া এই পাণ্ডুলিপিটি সম্পূর্ণ এক অজানা লিপিতে
লেখা। আজ পর্যন্ত পৃথিবীর বাঘা বাঘা বিশেষজ্ঞরা আপ্রান চেষ্টা করেও এই পান্ডুলিপি
থেকে একটি শব্দের অর্থও উদ্ধার করতে পারেননি। বইটির পাতায় পাতায় এমন সব অদ্ভুত
উদ্ভিদের ছবি আঁকা রয়েছে, বাস্তবে যেগুলোর কোনো অস্তিত্বই নেই। শুধু তাই নয়, পুরো
পাণ্ডুলিপিটি বিচিত্র সব জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক চিত্র এবং রহস্যময় প্রতীকে ঠাসা।
এই পাণ্ডুলিপিটির প্রকৃত রহস্য লুকিয়ে আছে এর দুর্ভেদ্যতার মাঝে; যতই চেষ্টা করা
হোক না কেন, একে কিছুতেই ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না। আধুনিক ক্রিপ্টোগ্রাফি বা
সংকেতবিদ্যা এবং ভাষাবিজ্ঞানের প্রভূত উন্নতি হওয়া সত্ত্বেও, এখন পর্যন্ত কেউই
নিশ্চিতভাবে বলতে পারেননি এতে কী লেখা আছে বা এর প্রকৃত অর্থ কী।
বইটি নিয়ে মতভেদও কম নয়। কিছু বিশেষজ্ঞের মতে, এটি হয়তো মানুষকে বিভ্রান্ত করার
জন্য তৈরি করা একটি জটিল প্রতারণা বা স্রেফ একটি সাজানো বই। আবার অনেকে বিশ্বাস
করেন, এটি প্রাচীনকালের হারিয়ে যাওয়া কোনো অমূল্য জ্ঞানভাণ্ডারের প্রতিনিধিত্ব
করছে, যার চাবিকাঠি আমাদের কাছে নেই।
বইটিতে কোন গোপন জাদুবিদ্যা বা আধ্যাত্মিক কোনো রহস্য সংকেত আকারে লুকানো থাকতে
পারে; এই প্রবল সম্ভাবনাই বইটির প্রতি মানুষের কৌতূহল দিনের পর দিন বহুগুণ বাড়িয়ে
দিচ্ছে। যদি এটি সত্যিই কোনো জাদুর বই হয়ে থাকে, তবে মানতেই হবে যে এটি কয়েক
শতাব্দী ধরে অত্যন্ত সফলভাবে নিজের গোপনীয়তা রক্ষা করে চলেছে। অন্যান্য গ্রিমোয়ার
বা জাদুর বইতে যেখানে স্পষ্ট সব নির্দেশ দেওয়া থাকে, সেখানে এই বইটির নিস্তব্ধতা
এবং রহস্যময়তা অনেক বেশি গা ছমছমে আর আতঙ্ক জাগানিয়া।
দ্য সিক্সথ অ্যান্ড সেভেন্থ বুকস অফ মোজেস (The Sixth and Seventh Books of Moses)
দ্য সিক্সথ অ্যান্ড সেভেনথ বুকস অফ মোজেস
একটি বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত গ্রন্থ। এতে দাবি করা হয়েছে যে, বাইবেলের নবী মোজেস
(যিনি ইসলাম ধর্মে হযরত মুসা আঃ বলে পরিচিত) এর কাছে যে গোপন
জাদুবিদ্যা ছিল, তারই রহস্য এই বইতে তুলে ধরা হয়েছে। ১৮শ শতাব্দীতে ইউরোপে প্রথম
প্রকাশ পাওয়ার পর থেকেই এটি জাদুর জগতে শোরগোল ফেলে দেয়। কালক্রমে আফ্রিকা ও
ক্যারিবীয় অঞ্চলের লোকজ জাদুবিদ্যার ঐতিহ্যে এটি এক অপরিহার্য ও জনপ্রিয় বইয়ে
পরিণত হয়।
বইটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো এতে ধর্মীয় বিশ্বাস এবং জাদুবিদ্যার এক অদ্ভুত
সমন্বয় দেখা যায়। এখানে বাইবেলের বিভিন্ন ঘটনার বর্ণনা, মহান সৃষ্টিকর্তার পবিত্র
নাম এবং ফেরেশতাদের ডাকার পদ্ধতির পাশাপাশি বিচিত্র সব মন্ত্র ও তাবিজের ব্যবহার
তুলে ধরা হয়েছে।
ধর্ম আর রহস্যবিদ্যার এই মিলেমিশে যাওয়া এক বড় বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। অনেকেই
প্রশ্ন তোলেন যে, এটি কি আসলেই প্রাচীন কোনো আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের অংশ, নাকি
পরবর্তী সময়ে কেবল ধর্মের দোহাই দিয়ে নিজের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর জন্য তৈরি করা
কোনো কৃত্রিম রচনা।
বইটিকে ঘিরে ডালপালা মেলা অসংখ্য জনশ্রুতি একে আরও রহস্যময় করে তুলেছে। কেউ কেউ
দাবি করেন যে, এই বইটি বংশপরম্পরায় অতি গোপনে রক্ষা করা কোনো প্রাচীন জ্ঞানের
সংকলন। আবার অন্য অনেকের ধারণা, পুরনো দিনের কোনো বিশাল গ্রন্থের বিচ্ছিন্ন কিছু
অংশ একত্রিত করে এটি তৈরি করা হয়েছে। এর উৎস নিয়ে এই যে ধোঁয়াশা, এটিই মূলত
বইটিকে যুগ যুগ ধরে গবেষক এবং সাধকদের কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু করে রেখেছে।
যারা এই বইটিতে বর্নিত জাদুবিদ্যার চর্চা করেন, তারা দীর্ঘদিন ধরে এই বইটিকে যেমন
ভক্তির চোখে দেখেছেন, তেমনি এর ব্যাপারে যথেষ্ট সাবধানও থেকেছেন। প্রচলিত ধর্মীয়
ইতিহাসের বাইরে গিয়ে মোজেসের মতো একজন মহান ব্যাক্তিত্ত্বকে জাদুকরী ক্ষমতার
অধিকারী হিসেবে কল্পনা করাটা সাধারণ মানুষের বিশ্বাসের জন্য বেশ কঠিনই বটে।
ধর্মের চেনা ছকের বাইরে এই যে ভিন্ন এক বর্ণনা, এটাই মূলত বইটিকে ঘিরে থাকা
রহস্যের আবরণকে আরও গাঢ় করে তুলেছে।
শেষ কথা
এই প্রবন্ধে উল্লেখ করা সাতটি জাদুর বইয়ের প্রতি মানুষের যে চিরস্থায়ী টান রয়েছে,
তা আমাদের স্বভাবের একটি মৌলিক দিককে ফুটিয়ে তোলে। আমরা সবসময়ই এমন কোনো গোপন
রহস্যের পেছনে ছুটতে পছন্দ করি, যা মহাবিশ্বের অজানা জট খুলে দেবে, অদৃশ্য শক্তির
ওপর নিয়ন্ত্রণ দেবে কিংবা আমাদের সাধারণ জ্ঞানের বাইরের কোনো সত্যকে সামনে আনবে।
তবে এই বইগুলোর প্রকৃত রহস্য হয়তো আত্মা নামানো বা বাস্তবতাকে বদলে দেওয়ার অলৌকিক
ক্ষমতার মাঝে নেই; বরং, মানুষের কল্পনাশক্তিকে মোহাবিষ্ট করার এবং ইতিহাস ও
কল্পনাকে এক সুতোয় গেঁথে ফেলার অসাধারণ ক্ষমতার মাঝেই এর রহস্য লুকিয়ে
রয়েছে।
এই বইগুলো আমাদের বুঝতে সাহায্য করে যে, আমাদের জানা জগৎ আর অজানা রহস্যের
মাঝখানের ব্যবধান আসলে খুবই সামান্য। সম্ভবত পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জাদু সেই
অমীমাংসিত রহস্যগুলোর মধ্যেই বাস করে, যেগুলো যুগ যুগ ধরে মানুষের ধরাছোঁয়ার
বাইরে রয়ে গেছে।








অতিপ্রাকৃতিক ব্লগের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url