অতিপ্রাকৃতিক সত্তা পরিচিতিঃ সাকিউবাস এবং ইনকিউবাস
মানব সভ্যতার শুরু থেকেই মানুষ তার চারপাশের রহস্যজনক জগতকে ব্যাখ্যা করার জন্য
বিচিত্র সব রুপকথা এবং পৌরানিক কাহিনী তৈরি করেছে। বিশেষ করে রাত, স্বপ্ন এবং
যৌনতার মতো রহস্যময় বিষয়গুলো ঘিরে গা শিউরে ওঠা অনেক গল্প গড়ে উঠেছে। এই
রহস্যময় চরিত্রগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও দীর্ঘস্থায়ী দুটি নাম হলো ইনকিউবাস
(Incubus) এবং সাকিউবাস (Succubus)।
প্রাচীন বিশ্বাস অনুযায়ী, এই সত্তাগুলো মানুষের ঘুমের গভীরে প্রবেশ করে তাদের
সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করে। ঘুমের মধ্যে তাদের এই উপস্থিতি স্বপ্ন এবং
বাস্তবতার মাঝখানের সীমারেখাকে এতটাই অস্পষ্ট করে দেয় যে, ভুক্তভোগীদের কাছে একে
নিছক কল্পনা বলে উড়িয়ে দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে। মূলত ঘুমের ঘোরে মানুষের বিচিত্র সব
অনুভূতি কিংবা রহস্যময় অভিজ্ঞতাগুলোকে ব্যাখ্যা করতেই প্রাচীন কাল থেকে এই
পৌরাণিক চরিত্রগুলোর সৃষ্টি হয়েছে।
এই প্রবন্ধে ইনকিউবাস ও সাকিউবাসের উৎপত্তি, বিবর্তন, প্রতীকী অর্থ এবং আধুনিক
ব্যাখ্যা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে, এবং একই সাথে এই সত্তাগুলো কীভাবে মানবজাতির
যৌনতা, নৈতিকতা ও অজানাকে ঘিরে উদ্বেগকে প্রতিফলিত করে তাও আলোচনা করা
হয়েছে।
সূচিপত্রঃ অতিপ্রাকৃতিক সত্তা পরিচিতি - সাকিউবাস এবং ইনকিউবাস
- প্রাচীন সভ্যতায় সাকিউবাস এবং ইনকিউবাসের উৎপত্তির ইতিহাস
- মধ্যযুগীয় ইউরোপিয়ান ধারনা
- সাকিউবাস এবং ইনকিউবাস এর মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা
- সাকিউবাস এবং ইনকিউবাসের প্রতীকী তাৎপর্য
- শিল্প ও সাহিত্যে ইনকিউবাস এবং সাকিউবাস
- সমকালীন সংস্কৃতি এবং আধুনিক গনমাধ্যমে সাকুউবাস এবং ইনকিউবাস
- চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে সাকিউবাস এবং ইনকিউবাস অভিজ্ঞতা
- শেষ কথা
প্রাচীন সভ্যতায় সাকিউবাস এবং ইনকিউবাসের উৎপত্তির ইতিহাস
ইনকিউবাস ও সাকিউবাস শব্দদুটি ল্যাটিন হলেও, ঘুমের মধ্যে মানুষের
কাছে আসা নিশাচর আত্মাদের ধারণা মধ্যযুগীয় ইউরোপের অনেক আগে থেকেই পৃথিবীর
বিভিন্ন সভ্যতায় প্রচলিত ছিল। প্রাচীন মেসোপটেমীয় (বর্তমানের ইরাক)
পুরাণে লিলিতু (Lilitu) এবং লিলু (Lilu) নামক বিশেষ কিছু সত্তার
কথা পাওয়া যায়।
সে সময় এই সত্তাগুলোকে রাতের ভয়ংকর পিচাশ হিসেবে গণ্য করা হতো, যারা মানুষকে
নানাভাবে লোভ দেখাতো এবং নানাভাবে তাদের ক্ষতিসাধন করতে চেষ্টা করত। তখনকার মানুষ
বিশ্বাস করত যে, রাতের দুঃস্বপ্ন, বন্ধ্যাত্ব এবং চিকিৎসার অতীত বিভিন্ন
রোগব্যাধির পেছনে আসলে এসব অশুভ আত্মার হাত রয়েছে। মূলত মানুষের আদিম ভয় এবং
অজানাকে ব্যাখ্যা করার প্রচেষ্টা থেকেই প্রাচীন এই পৌরাণিক চরিত্রগুলোর জন্ম
হয়েছিল।
ইহুদী লোককথায় উল্লেখ করা একটি অন্যতম চরিত্র লিলিথ (Lilith) প্রাচীন এই
পৌরাণিক কাহিনিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত হিসেবে গন্য হয়ে থাকে। শুরুর দিকে তাকে
সরাসরি সাকিউবাস বলা না হয়ে থাকলেও, সময়ের সাথে সাথে তার চরিত্রটি এক
ভয়ংকর নারী পিশাচ হিসেবে পরিচিতি পায়। লোককথা অনুযায়ী, তিনি রাতে পুরুষদের
প্রলুব্ধ করতেন এবং নবজাতক শিশুদের ওপর আক্রমণ চালাতেন।
তবে লিলিথের এই চরিত্রের পেছনে একটি গভীর সামাজিক দিক রয়েছে। প্রাচীন ইহুদী সমাজে
লিলিথকে মূলত নারীর স্বাধীনতা ও নিজের ইচ্ছামতো জীবনযাপনের প্রতীক বলে মনে করা
হতো। অনেক নৃতাত্ত্বিকদের মতে, তখনকার পুরুষশাসিত সমাজ এই স্বাধীনচেতা স্বভাবকে
মেনে নিতে পারেনি বলেই তাকে পিশাচিনী হিসেবে উপস্থাপন করেছিল। লিলিথকে ঘিরে গড়ে
ওঠা এই রহস্যময় গল্পগুলোই পরবর্তী সময়ে নারী যৌন দানব বা সাকিউবাস সম্পর্কে
মানুষের মনে স্থায়ী ধারণার বীজ বুনে দিয়েছিল।
একইভাবে, প্রাচীন গ্রিক পুরাণেও দেবতা ও আত্মাদের মানুষের স্বপ্নে দেখা দেওয়ার
বিষয়টি বেশ জনপ্রিয় ছিল। তাদের সমাজে এই ধরনের অতিপ্রাকৃতিক ঘটনাকে সবসময়ে অশূভ
বা ক্ষতিকর ঘটনা হিসাবে দেখা না হয়ে থাকলেও, সেগুলোর মধ্যে প্রলোভন বা এক ধরনের
জোরপূর্বক সম্পর্কের আভাস থাকত।
এই কাহিনিগুলো মানুষের মনে একটি বিশেষ ধারণাকে আরও গভীর করে তুলেছিল। আর তা হলো,
অতিপ্রাকৃত শক্তিগুলো মানুষের সবচেয়ে দুর্বল মুহূর্তগুলোতে, বিশেষ করে ঘুমের সময়,
তাদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে। মূলত মানুষের অবচেতন মনের ইচ্ছা আর
রহস্যময় স্বপ্নগুলোকেই গ্রিক পুরাণে এভাবে দেবতাদের ছদ্মবেশে উপস্থাপন করা
হয়েছে।
মধ্যযুগীয় ইউরোপিয়ান ধারনা
মধ্যযুগে ইউরোপে, বিশেষ করে খ্রিস্টীয় ধর্মতত্ত্বের প্রভাবে ইনকিউবাস ও
সাকিউবাস সম্পর্কে মানুষের ধারণা আরও সুনির্দিষ্ট রূপ পায়। এই শব্দ দুটির
উৎপত্তিগত অর্থ বিশ্লেষণ করলেই আমাদের সামনে এদের বৈশিষ্ট্য পরিষ্কার হয়ে
যায়ঃ
- ইনকিউবাস (Incubus)ঃ এই শব্দটি এসেছে ল্যাটিন incubare থেকে, যার আক্ষরিক অর্থ হলো উপরে শোয়া। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, এটি একটি পুরুষ দানব, যে ঘুমের মাঝে নারী ভুক্তভোগীর শরীরের ওপর চেপে বসে।
- সাকিউবাস (Succubus)ঃ এই শব্দটি এসেছে ল্যাটিন succubare থেকে, যার অর্থ হলো নিচে শোয়া। একে কল্পনা করা হয় একজন নারী দানব হিসেবে, যে পুরুষ ভুক্তভোগীর নিচে অবস্থান করে তাকে প্রলুব্ধ করে।
মধ্যযুগের ধর্মতাত্ত্বিক ও পণ্ডিতরা ইনকিউবাস এবং সাকিউবাসের অস্তিত্বকে অত্যন্ত
গুরুত্বের সাথে দেখতেন। এমনকি
টমাস অ্যাকুইনাস-এর মতো প্রখ্যাত দার্শনিকেরাও তাদের ধর্মীয় গ্রন্থে এই সত্তাগুলোর ক্ষমতা ও
প্রকৃতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। অ্যাকুইনাসের ব্যাখ্যাটি ছিল বেশ অদ্ভুত ও
কৌশলী। তাঁর মতে, অশরীরী সত্তাদের নিজস্ব কোন প্রজনন ক্ষমতা নেই। তারা প্রথমে
সাকিউবাস রূপ ধরে পুরুষদের কাছ থেকে বীর্য সংগ্রহ করে। পরবর্তীতে ইনকিউবাস রূপ
ধারণ করে সেই বীর্য ব্যবহার করে কোনো নারীকে গর্ভবতী করে ফেলে।
মূলত ঘুমের ঘোরে দানবদের সাথে মানুষের মিলন এবং তার ফলে সন্তান জন্মের মতো
দাবিগুলোকে তৎকালীন খ্রিস্টীয় প্রজননতত্ত্বের সাথে খাপ খাইয়ে নিতেই অ্যাকুইনাস
এই জটিল তত্ত্বের অবতারণা করেছিলেন।
এই পৌরাণিক বিশ্বাসগুলো এক সময় মানুষের জন্য রীতিমতো বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
মধ্যযুগের ইউরোপের কুখ্যাত
ডাইনি নিধন
বা জাদুবিদ্যার বিচারগুলোতে ইনকিউবাসের সাথে সম্পর্কের কথা বলে অনেক নারীকে দোষী
সাব্যস্ত করা হতো। বিশেষ করে যেসব মেয়েরা সমাজের প্রচলিত নিয়ম মেনে চলতেন না,
তাদের ওপরই এই অপবাদ বেশি দেওয়া হতো। এভাবে দানবীয় মিলনের গল্প শুনিয়ে তৎকালীন
সমাজ ব্যবস্থা মানুষের ব্যক্তিগত জীবন ও নারীর যৌনতাকে শাসন করার একটি উপায় বের
করে নিয়েছিল।
সাকিউবাস এবং ইনকিউবাস এর মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা
আধুনিক বিজ্ঞান ও মনোবিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে রক্ত-মাংসের দানব বা অশুভ আত্মায়
মানুষের বিশ্বাস আগের চেয়ে অনেক কমে গেছে। তবে মজার বিষয় হলো, ইনকিউবাস বা
সাকিউবাসের সাথে যুক্ত সেই গা শিউরে ওঠা অভিজ্ঞতাগুলো কিন্তু মানুষের জীবন থেকে
হারিয়ে যায়নি। বর্তমানে এই অতিপ্রাকৃত ঘটনাগুলোকে বিজ্ঞানের ভাষায় অত্যন্ত
যৌক্তিকভাবে ব্যাখ্যা করা হয়, যার অন্যতম প্রধান কারণ হলো
স্লিপ প্যারালাইসিস
বা বোবায় ধরা।
স্লিপ প্যারালাইসিস বা লোকমুখে প্রচলিত বোবায় ধরা হলো ঘুমের এমন
এক অদ্ভুত অবস্থা, যেখানে মানুষ জেগে থাকলেও সাময়িকভাবে নড়াচড়া করার ক্ষমতা
হারিয়ে ফেলে। সাধারনত এই অবস্থায় ঘুম থেকে জাগার ঠিক আগ মুহূর্তে বা
তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় শরীর পুরোপুরি অচল হয়ে পড়ে। এই সময়ে আক্রান্ত ব্যক্তি
প্রায়ই জীবন্ত কোনো বিভ্রম (hallucination) দেখেন বা ঘরে অন্য কারোর উপস্থিতি
অনুভব করেন।
সেই সময়ে অনেকে মনে করেন যে কেউ তাদের বুকে ভারী কিছু দিয়ে চেপে ধরে রাখছে, যার
ফলে ভুক্তভোগীদের মনে তীব্র ভয় এবং আতঙ্কের সৃষ্টি হয়। মধ্যযুগীয় ইউরোপীয় লোককথায়
এই অনুভূতিগুলোকে প্রায়ই ইনকিউবাস -এর আক্রমণ হিসেবে বর্ণনা করা
হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে, ইনকিউবাস ও সাকিউবাসকে একটি সর্বজনীন মানব অভিজ্ঞতার সাংস্কৃতিক
ব্যাখ্যা হিসেবে দেখা যেতে পারে। বিভিন্ন সংস্কৃতিতে এই সত্তাগুলোর নিজস্ব ভিন্ন
রূপ রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, জাপানে এই ঘটনাকে
কানাশিবারি নামে পরিচিত, আর আফ্রিকার কিছু অঞ্চলে এটিকে জাদুবিদ্যা বা আধ্যাত্মিক
আক্রমণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
স্লিপ প্যারালাইসিসের এই রহস্যময় অভিজ্ঞতাকে কেবল বিজ্ঞান বা লোককথা নয়, বরং
মনোবিশ্লেষণের (Psychoanalysis) মাধ্যমেও ব্যাখ্যা করা হয়েছে। প্রখ্যাত
মনোবিজ্ঞানী সিগমুন্ড ফ্রয়েড এবং তাঁর অনুসারীদের মতে, ঘুমের ঘোরে দেখা এই ভীতিকর
অভিজ্ঞতাগুলো অনেক সময় আমাদের মনের ভেতরে চেপে রাখা যৌন আকাঙ্ক্ষা বা তীব্র
দুশ্চিন্তার বহিঃপ্রকাশ হতে পারে।
কোনো রহস্যময় বা ভয়ংকর সত্তার সাথে সংযোগযুক্ত স্বপ্নগুলো মূলত মানুষের মনের
ভেতরের দ্বন্দ্ব, অপরাধবোধ কিংবা সমাজ বা বিবেকের ভয়ে লুকিয়ে রাখা
নিষিদ্ধ কোনো ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটায়। ফ্রয়েডীয় তত্ত্বে এই ধরণের অভিজ্ঞতাকে
সরাসরি শারীরিক কোনো ঘটনা না বলে বরং মনের গভীরে থাকা জটিল আবেগের একটি প্রতীকী
প্রকাশ হিসেবে দেখা হয়ে থাকে। সহজ কথায়, আমরা যা বাস্তবে প্রকাশ করতে পারি না,
অবচেতন মন অনেক সময় ঘুমের ঘোরে এমন ভয়ংকর বা রহস্যময় অভিজ্ঞতার মাধ্যমে তা আমাদের
সামনে নিয়ে আসে।
সাকিউবাস এবং ইনকিউবাসের প্রতীকী তাৎপর্য
মনস্তাত্ত্বিক এবং বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার বাইরেও ইনকিউবাস এবং সাকিউবাসের
চরিত্রগুলো অত্যন্ত গভীর কিছু প্রতীকী অর্থ বহন করে। এগুলো মূলত মানুষের মনের
ভেতরকার ইচ্ছেগুলোর দুইটি বিপরীত দিককে তুলে ধরে; যা একই সাথে আনন্দদায়ক এবং
বিপজ্জনক হতে পারে। অনেক কাহিনীতে দেখা যায়, ভুক্তভোগীরা রাতের বেলায় তাদেরকে
আক্রমন করা পিচাশদের প্রতি একই সঙ্গে তীব্র আকর্ষণ এবং চরম আতঙ্ক অনুভব
করে।
এই দিক থেকে দেখলে, ইনকিউবাস ও সাকিউবাস কেবল কাল্পনিক দানব নয়; তারা আমাদের মনের
সেইসব নিষিদ্ধ বা জটিল অনুভূতিগুলোর রূপক, যা আমরা প্রকাশ্যে স্বীকার করতে পারি
না কিন্তু অবচেতনে বয়ে বেড়াই। এই মানসিক দ্বন্দ্বের কারণেই এই লোককথাগুলো আজও
মানুষের কাছে এত রহস্যময়।
মধ্যযুগীয় খ্রিস্টীয় ধর্মতত্ত্বে ইনকিউবাস ও সাকিউবাসের এই চরিত্রগুলোকে মূলত
কামাসক্তি এবং প্রলোভনের বিরুদ্ধে এক ধরনের সতর্কবার্তা হিসেবে ব্যবহার করা হতো।
বিশেষ করে সাকিউবাসকে অত্যন্ত রূপবতী কিন্তু প্রাণঘাতী এক নারী হিসেবে
চিত্রায়িত করা হতো। সাকিউবাসের এই রূপ এটাই বোঝাত যে, বাইরের চাকচিক্যময়
সৌন্দর্য আসলে ভেতরের এক চরম আধ্যাত্মিক বিপদ বা ধ্বংসকে আড়াল করে রাখতে পারে।
সাকিউবাসের এই সুন্দরী কিন্তু ভয়ংকর রূপটি থেকেই আধুনিক যুগের জনপ্রিয়
ফেম ফাতাল (Femme Fatale) বা রহস্যময়ী নারী চরিত্রগুলোর ধারণা জন্ম
নিয়েছে।
অন্যদিকে, ইনকিউবাস চরিত্রটি মূলত পুরুষালি যৌনতা ও আগ্রাসনকে ঘিরে থাকা ভয়ের এক
প্রতীক। নারীদের স্বপ্নে বা বাস্তবে ইনকিউবাসের হানা দেওয়ার গল্পগুলো আসলে
সম্মতি, ক্ষমতা এবং অসহায়ত্ব নিয়ে তাদের মনের গভীর উদ্বেগেরই বহিঃপ্রকাশ। এই
ধারণার পেছনে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক দিক রয়েছে।
অনেকে বিশেষজ্ঞদের মতে, আগেকার দিনে যখন সমাজ ও পরিবারে নারীদের স্বাধীনতা ও অধিকার অত্যন্ত সীমিত ছিল, তখন তাদের ওপর হওয়া কোনো শারীরিক বা মানসিক আঘাত (ট্রমা) সরাসরি প্রকাশ করা অনেক কঠিন ছিল। তাই হয়তো সেই তিক্ত অভিজ্ঞতাগুলোকে ব্যাখ্যা করতে দানবের আক্রমন-এর মত কাহিনীর আশ্রয় নেওয়া হতো।
ইনকিউবাসদের নিয়ে এই ভয় তাই মূলত সমাজে নারীর দুর্বল অবস্থান এবং তাদের দেহ ও মনের উপরে পুরুষের অনাকাঙ্ক্ষিত নিয়ন্ত্রণের একটি রূপক হিসেবে কাজ করত। এটি ছিল তৎকালীন সমাজব্যবস্থায় নারীর অবদমিত ভয় এবং তাদের জীবনের কঠিন বাস্তবতাকে আড়াল করার একটি মাধ্যম। অতিপ্রাকৃতিক গল্পের ছদ্মবেশে মানুষ আসলে বাস্তবের গভীর কোনো মানসিক ক্ষতকেই বোঝার চেষ্টা করত।
অনেকে বিশেষজ্ঞদের মতে, আগেকার দিনে যখন সমাজ ও পরিবারে নারীদের স্বাধীনতা ও অধিকার অত্যন্ত সীমিত ছিল, তখন তাদের ওপর হওয়া কোনো শারীরিক বা মানসিক আঘাত (ট্রমা) সরাসরি প্রকাশ করা অনেক কঠিন ছিল। তাই হয়তো সেই তিক্ত অভিজ্ঞতাগুলোকে ব্যাখ্যা করতে দানবের আক্রমন-এর মত কাহিনীর আশ্রয় নেওয়া হতো।
ইনকিউবাসদের নিয়ে এই ভয় তাই মূলত সমাজে নারীর দুর্বল অবস্থান এবং তাদের দেহ ও মনের উপরে পুরুষের অনাকাঙ্ক্ষিত নিয়ন্ত্রণের একটি রূপক হিসেবে কাজ করত। এটি ছিল তৎকালীন সমাজব্যবস্থায় নারীর অবদমিত ভয় এবং তাদের জীবনের কঠিন বাস্তবতাকে আড়াল করার একটি মাধ্যম। অতিপ্রাকৃতিক গল্পের ছদ্মবেশে মানুষ আসলে বাস্তবের গভীর কোনো মানসিক ক্ষতকেই বোঝার চেষ্টা করত।
শিল্প ও সাহিত্যে ইনকিউবাস এবং সাকিউবাস
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ইনকিউবাস ও সাকিউবাসের এই চরিত্রগুলো শিল্পকলা ও
সাহিত্যে নানা বৈচিত্র্যময় রূপে উঠে এসেছে। বিশেষ করে রেনেসাঁ যুগে শিল্পীরা
দানবীয় প্রলোভন এবং রাতের আঁধারে তাদের আগমনের দৃশ্যগুলোকে অত্যন্ত নিপুণভাবে
ফুটিয়ে তুলতেন। তাদের তুলির আঁচড়ে এই অতিপ্রাকৃতিক সত্তাগুলো এক জীবন্ত এবং
রোমহর্ষক রূপ লাভ করেছিল।
গথিক সাহিত্যে
প্রলোভন, বিপদ এবং অতিপ্রাকৃতিক শক্তির মতো বিষয়গুলো প্রধান বৈশিষ্ট্য হিসেবে উঠে
আসে, যেখানে ইনকিউবাস ও সাকিউবাসের ধারণাগুলো ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। বিশেষ
করে ব্রাম স্টোকারের ড্রাকুলা (Dracula)-এর মতো কালজয়ী রচনাগুলো এই
প্রাচীন দানবীয় তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে।
এই বইয়ের প্রধান ভ্যাম্পায়ার চরিত্র কাউন্ট ড্রাকুলাকে মূলত ইনকিউবাস ও
সাকিউবাসের একটি আধুনিক সংমিশ্রণ হিসেবে দেখা যায়। উদাহরন স্বরুপ, প্রাচীন সেই
দানবদের মতোই ভ্যাম্পায়াররা তাদের শিকারকে প্রথমে মোহাচ্ছন্ন করে প্রলুব্ধ করে
এবং পরে তাদের শরীর থেকে জীবনশক্তি (রক্ত) শুষে নেয়। ইনকিউবাস বা সাকিউবাসের
চিরাচরিত স্বভাবের মতো ভ্যাম্পায়াররাও রাতের আঁধারে মানুষের ঘুমের সুযোগ নিয়ে
আক্রমণ করে।
সহজ কথায়, গথিক উপন্যাসের ভ্যাম্পায়াররা আসলে সেই পুরনো দিনের
ইনকিউবাস-সাকিউবাসেরই এক বিবর্তিত এবং আরও মার্জিত রূপ। এই চরিত্রগুলোর মাধ্যমে
লেখকরা মানুষের মনের অবদমিত আকাঙ্ক্ষা আর অতিপ্রাকৃতিক অজানার প্রতি ভয়কে অত্যন্ত
নিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।
রোমান্টিক এবং ভিক্টোরিয়ান যুগের সাহিত্যে ইনকিউবাস বা সাকিউবাসকে কেবল
ভয়ংকর দানব হিসেবে না দেখিয়ে বরং অনেক বেশি মানবিক ও জটিলভাবে উপস্থাপন
করা হয়েছে। এই যুগের লেখকরা তাদের গল্প এবং উপন্যাসে এই চরিত্রগুলোকে অনেক সময়
বেশ অসহায় এবং জটিল হিসেবে দেখিয়েছেন।
যেমন, কোনো কোনো গল্পে সাকিউবাসকে দেখা যায় এক অভিশপ্ত নারী হিসেবে। সে হয়তো
কাউকে মন থেকে ভালোবাসতে চায়, কিন্তু তার স্বভাবগত প্রকৃতি বা অতিপ্রাকৃতিক
অভিশাপ তাকে সেই প্রিয় মানুষটিরই ক্ষতি করতে বা তার জীবনশক্তি কেড়ে নিতে বাধ্য
করে। এই চরিত্রগুলো পাঠককে ভয় দেখানোর চেয়ে বরং তাদের প্রতি এক ধরণের করুণা বা
সহানুভূতি তৈরি করে। মূলত মানুষের মনের ইচ্ছা আর ভাগ্যের নিষ্ঠুর লড়াইকে বোঝাতেই
লেখকরা এই প্রাচীন দানবদের এমন সংবেদনশীল রূপে ফুটিয়ে তুলেছেন।
সমকালীন সংস্কৃতি এবং আধুনিক গনমাধ্যমে সাকুউবাস এবং ইনকিউবাস
সমকালীন বা আধুনিক সংস্কৃতিতে ইনকিউবাস ও সাকিউবাসের ধারণাগুলো সম্পূর্ণ নতুন
রূপে ফিরে এসেছে। এখন আর তারা কেবল অন্ধকার ঘরের ভয়ংকর দানব নয়; বরং চলচ্চিত্র,
টিভি সিরিজ, ভিডিও গেম এবং উপন্যাসে তাদের বৈশিষ্ট্যগুলোকে আধুনিক জীবনধারা ও
চিন্তাভাবনার সাথে মিলিয়ে উপস্থাপন করা হয়।
আধুনিক গল্পগুলোতে ইনকিউবাস ও সাকিউবাসকে প্রায়ই এমনভাবে দেখানো হয় যা মানুষের
যৌন আকাঙ্ক্ষা, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা এবং আত্মপরিচয় নিয়ে সমসাময়িক দৃষ্টিভঙ্গিকে
প্রতিফলিত করে। অনেক ক্ষেত্রে তাদের কেবল ভিলেন হিসেবে না দেখিয়ে জটিল
আবেগসম্পন্ন চরিত্র হিসেবে দেখানো হয়, যারা নিজেদের অস্তিত্ব বা নৈতিকতার সাথে
লড়াই করছে। ভিডিও গেম বা ফ্যান্টাসি সিরিজে তাদেরকে অনেক সময় শক্তিশালী এবং
আকর্ষণীয় চরিত্র হিসেবে উপস্থাপন করা হয়ে থাকে।
ফ্যান্টাসি এবং রোল-প্লেয়িং গেমের (RPG) দুনিয়ায় ইনকিউবাস ও সাকিউবাসের
চরিত্রগুলো এখন অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে। এখানে তাদের কেবল
সাধারণ অশুভ আত্মা হিসেবে নয়, বরং বিশেষ জাদুকরী ক্ষমতার অধিকারী শক্তিশালী সত্তা
হিসেবে উপস্থাপন করা হয়ে থাকে। গেমগুলোতে তাদের প্রধান শক্তি হলো প্রলোভন, মায়া
বা ইল্যুশন তৈরি করা এবং অন্যের মন নিয়ন্ত্রণ করা। তারা শারীরিক শক্তির চেয়ে
বুদ্ধিমত্তা এবং চার্ম ব্যবহার করে প্রতিপক্ষকে কুপোকাত করতে বেশি পারদর্শী।
অনেক সময় এই চরিত্রগুলো কেবল ভিলেন বা শত্রু হিসেবে থাকে না; অনেক গেমে খেলোয়াড়রা
নিজেই সাকিউবাস বা ইনকিউবাস চরিত্র হিসেবে খেলার সুযোগ পায়। আগেকার দিনে এই
সত্তাগুলো ছিল কেবল অতিপ্রাকৃতিক ভয়ের উৎস হলেও, বর্তমান কালের ভিডিও গেমের জগতে
তারা এখন বেশ আকর্ষণীয় ও রহস্যময় জায়গা দখল করে আছে। এর ফলে বোঝা যায় যে, মানুষের
মনে এই চরিত্রগুলো নিয়ে প্রাচীন আতঙ্ক এখন কৌতূহল ও আকর্ষণে রূপ নিয়েছে।
এই সত্তাগুলোর বিবর্তন আসলে আমাদের সমাজের চিন্তা-চেতনার পরিবর্তনেরই একটি
বহিঃপ্রকাশ। সমাজ এখন যৌনতা এবং মানুষের মনের গভীর ইচ্ছাগুলো নিয়ে আগের চেয়ে অনেক
বেশি খোলামেলা আলোচনা করে, যার ফলে এই চরিত্রগুলোকে ঘিরে থাকা প্রাচীন
নিষিদ্ধ ভাব বা লোকলজ্জা অনেকটাই কমে এসেছে। আবার, নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি
মানুষের চিরন্তন এক ধরণের টান থাকে। এই সত্তাগুলোর সাথে আকাঙ্ক্ষা এবং
বিপদ; এই দুটি বিষয় এমনভাবে মিশে আছে যা তাদেরকে আজও মানুষের কাছে
সমানভাবে রহস্যময় ও আকর্ষণীয় করে রেখেছে।
চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে সাকিউবাস এবং ইনকিউবাস অভিজ্ঞতা
আজকের দিনের অধিকাংশ চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা ইনকিউবাস এবং সাকিউবাসের সাথে সম্পর্কিত
অভিজ্ঞতাগুলোকে প্রাকৃতিক ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন। স্লিপ প্যারালাইসিস,
হিপনাগগিক ভ্রম (Hypnagogic hallucinations, ঘুমিয়ে পড়ার সময় ঘটে), এবং
হিপনোপম্পিক ভ্রম (Hypnopompic hallucainatons, ঘুম থেকে জাগার সময়ে ঘটে); এসব
জটিলতাই ভুক্তভোগীদের মনে জীবন্ত এবং কখনও কখনও ভীতিকর অভিজ্ঞতা তৈরি করতে
পারে।
এই ধরনের অভিজ্ঞতার মধ্যে স্পর্শ, চাপ অনুভব করা, এমনকি যৌন কার্যকলাপের অনুভূতিও
থাকতে পারে। এসব অভিজ্ঞতার ব্যাখ্যা অনেকটাই ব্যাক্তির সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটের
উপর নির্ভর করে। যেসব সমাজে দানব বা অতিপ্রাকৃতিক সত্তার প্রতি দৃড় বিশ্বাস
রয়েছে, সেখানে ভুক্তভোগীরা প্রায়ই তাদের এই অভিজ্ঞতাগুলোকে অতিপ্রাকৃতিক কারনের
ফলাফল হিসেবে ব্যাখ্যা করে থাকেন।
এই ঘটনাগুলোকে বৈজ্ঞানিকভাবে ব্যাখ্যা করা গেলেও ভুক্তভোগীদের কাছে এর আবেগগত
প্রভাব কমে যায় না। যারা এসব অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যায়, তাদের কাছে এই
অনুভূতিগুলো একেবারে বাস্তব বলে মনে হতে পারে, যা ইনকিউবাস ও সাকিউবাসের পৌরানিক
ধারনার শক্তিকে আরও জোড়দার করে।
শেষ কথা
ইনকিউবাস এবং সাকিউবাস কেবল লোককথার চরিত্র নয়; তারা মানবজাতির গভীরতম ভয় এবং
আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন, যা প্রাচীন মেসোপটেমিয়া থেকে আধুনিক পপ সংস্কৃতি পর্যন্ত
মানুষের মন, শরীর এবং নৈতিকতা সম্পর্কে ধারণার সঙ্গে সঙ্গে বিকশিত হয়েছে। তারা
যৌনতা, ভয় এবং অজানার সংযোগস্থলে অবস্থান করে, কখনো সতর্কতামূলক গল্প হিসেবে,
আবার কখনো মানব কৌতূহলের প্রকাশ হিসেবে কাজ করে।
এগুলোকে বাস্তব দানব, মনস্তাত্ত্বিক ঘটনা, অথবা প্রতীকী নির্মাণ; যেভাবেই
ব্যাখ্যা করা হোক না কেন, ইনকিউবাস ও সাকিউবাস মানুষের কল্পনাশক্তিকে এখনও মুগ্ধ
করে রাখে। তাদের এই স্থায়ী উপস্থিতি ইঙ্গিত দেয় যে, আমাদের ব্যাখ্যা পরিবর্তিত
হলেও, তারা যে অভিজ্ঞতা ও আবেগকে প্রতিনিধিত্ব করে তা মানব অস্তিত্বের একটি মৌলিক
অংশ হিসেবেই রয়ে গেছে।



অতিপ্রাকৃতিক ব্লগের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url