দ্য ইজিপশিয়ান বুক অব দা ডেডঃ মৃত্যু পরবর্তী জীবনের নির্দেশিকা

প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতার রেখে যাওয়া অসংখ্য অমূল্য ঐতিহ্যের মধ্যে দ্য বুক অব দ্য ডেড (Book of the Dead) বা মৃতদের বই নিঃসন্দেহে সবচেয়ে আকর্ষণীয়, রহস্যময় ও প্রভাবশালী হয়ে আছে। তিন হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে নীল নদের তীরে গড়ে ওঠা এই সভ্যতা মৃত্যু, আত্মা আর পরকালকে কেন্দ্র করে এক জটিল ও চমৎকার বিশ্বাস ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল। তারা মৃত্যুকে কেবল জীবনের সমাপ্তি হিসেবে না ধরে, বরং একে এক নতুন এবং অনন্ত যাত্রার শুরু হিসেবে দেখত। 

নামে বই বা গ্রন্থ বলা হলেও, বুক অব দ্য ডেড আসলে কোনো একক বই বা ধারাবাহিক গল্প নয়। এটি মূলত বিভিন্ন জাদুমন্ত্র, প্রার্থনা, স্তোত্র আর নির্দেশনার এক বিশাল সংকলন। পরকালের বিপজ্জনক পথগুলো পেরিয়ে মৃত ব্যক্তি যেন নিরাপদে তাঁর গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেন, সেটাই ছিল এই মন্ত্রগুলোর মূল উদ্দেশ্য। 

দ্য-ইজিপশিয়ান-বুক-অব-দ্য-ডেডঃ মৃত্যু-পরবর্তী-জীবনের-নির্দেশিকা

 

এই মন্ত্র ও লেখাগুলোর মধ্য দিয়ে প্রাচীন মিশরীয়দের ধর্মীয় বিশ্বাস, তাঁদের আশা-আকাঙ্ক্ষা, ভয় এবং মানব জীবন নিয়ে তাঁদের গভীর দর্শনের পরিচয় পাওয়া যায়। একইসাথে এর ভেতরে লুকিয়ে থাকা অমীমাংসিত বিষয়গুলো আজও ইতিহাসবিদ, প্রত্নতাত্ত্বিক, রহস্য-অনুরাগী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ; সবাইকে সমানভাবে মুগ্ধ ও কৌতূহলী করে রেখেছে।  

দ্য ইজিপশিয়ান বুক অব দ্য ডেডঃ মৃত্যু পরবর্তী জীবনের নির্দেশিকা 

এই বইয়ের উৎপত্তি এবং ঐতিহাসিক বিকাশ

দ্য-ইজিপশিয়ান-বুক-অব-দ্য-ডেডঃ মৃত্যু-পরবর্তী-জীবনের-নির্দেশিকা
উনাস (Unas, রাজত্বকাল ২৩৭৫-২৩৪৫ খ্রিস্টপূর্ব)-এর সমাধিকক্ষের (Burial chamber) দেয়ালে খোদাই করা পিরামিড টেক্সট

 
বুক অব দ্য ডেড-এর উৎস খুঁজতে গেলে আমাদের একদম প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতার গোড়ার দিকে ফিরে যেতে হবে। এই সংকলনটি চূড়ান্ত রূপ ধারণ করার বহু আগে, প্রাচীন রাজত্বকালে (Old Kingdom Period, প্রায় ২৬৮৬–২১৮১ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) মিশরীয় পুরোহিতরা পিরামিড টেক্সটস নামের এক ধরণের ধর্মীয় বাণী ও মন্ত্র রচনা করেছিলেন। এই পবিত্র মন্ত্র ও বাণীগুলো তখন কেবল রাজকীয় সমাধির দেওয়ালেই খোদাই করা হতো এবং এর ব্যবহার পুরোপুরি ফারাও বা রাজপরিবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।
 
দ্য-ইজিপশিয়ান-বুক-অব-দ্য-ডেডঃ মৃত্যু-পরবর্তী-জীবনের-নির্দেশিকা
মধ্য রাজত্বকালের একটি কফিন টেক্সট

 
 
পরবর্তীকালে, মধ্য রাজত্বকাল (Middle Kingdom Period, প্রায় ২০৫৫–১৬৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) নাগাদ এই ধারাটি আরও বিকশিত হয়ে কফিন টেক্সটস-এর রূপ নেয়। আগের পিরামিড টেক্সটস -এর তন্ত্র মন্ত্রগুলোর মত এগুলো আর শুধু রাজকীয় সমাধির দেওয়ালে বন্দি রইল না, বরং সরাসরি কফিনের গায়ে লেখা হতে লাগল। এর চেয়েও বড় পরিবর্তন ছিল, ফারাওদের পাশাপাশি সমাজের ধনী ও সাধারণ অভিজাত ব্যক্তিরাও এগুলো ব্যবহারের সুযোগ পেতে শুরু করেন। এটি ছিল প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতার ধর্মীয় ভাবনায় এক বিশাল পরিবর্তন; কারন পরকালের অনন্ত জীবনে প্রবেশের অধিকার আর কেবল রাজপরিবারের একার সম্পত্তি রইল না, তা সাধারণ মানুষের জন্যও উন্মুক্ত হতে শুরু করল। 
 
নতুন রাজত্বকালে (The New Kingdom Period, প্রায় ১৫৫০–১০৭০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) আগের এই সব প্রাচীন ঐতিহ্য একসাথে জুড়ে গিয়ে এক পূর্ণাঙ্গ রূপ নেয়। আধুনিক গবেষকদের কাছে এটিই বুক অব দ্য ডেড নামে পরিচিত। তবে প্রাচীন মিশরীয়দের কাছে এটি দ্য বুক অব গোয়িং ফোর্থ বাই ডে  (The Book of Going Forth by Day, দিনের আলোয় বেরিয়ে আসার গ্রন্থ) নামে পরিচিত ছিল। 
 
এই নামের পেছনে চমৎকার একটি বিশ্বাস লুকিয়ে ছিল। প্রাচীন মিশরীয়রা বিশ্বাস করত যে, সূর্য যেমন প্রতিদিন সন্ধ্যায় দিগন্তে ডুবে যাওয়ার পরে পরদিন সকালে আবার নতুন করে উদিত হয়, ঠিক তেমনি ভাবে মৃত ব্যক্তির আত্মাও তাঁর সমাধি থেকে বের হয়ে এসে পরকালের জীবনে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়াতে পারে। 
 
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে লিপিকাররা এই সংকলনটিকে বারবার সংশোধন করেছেন, এর পরিধি বাড়িয়েছেন এবং মানুষের ব্যক্তিগত প্রয়োজন অনুযায়ী এতে নানা রকম পরিবর্তন এনেছেন। এর ফলে, বুক অব দ্য ডেড-এর কোনো দুটি অনুলিপি বা কপি কখনোই হুবহু এক হতো না। 
 
ধনী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা নিজেদের জন্য একেবারে আলাদা ও বিশেষ সংস্করণ তৈরি করিয়ে নিতেন, যেখানে তাঁদের পছন্দ ও প্রয়োজন অনুযায়ী নির্দিষ্ট কিছু মন্ত্র ও পাঠ বেছে নেওয়া হতো। এই স্ক্রল বা পাণ্ডুলিপিগুলো চমৎকার সব রঙ-বেরঙের চিত্রে সাজানো থাকত এবং এগুলোর দৈর্ঘ্যে হতো বেশ কয়েক মিটার। অন্যদিকে, সাধারণ মানুষের জন্য তৈরি সংস্করণে কেবল অতি প্রয়োজনীয় ও মূল মন্ত্রগুলোই জায়গা পেত।
 

প্রাচীন মিশরীয়রা মৃত্যুকে যেভাবে দেখত  

বুক অব দ্য ডেড গ্রন্থটিকে সঠিকভাবে বুঝতে হলে, সবার আগে মৃত্যু সম্পর্কে প্রাচীন মিশরীয়দের মূল ধারণাটি পরিষ্কার হওয়া দরকার। প্রাচীন মিশরীয়রা বিশ্বাস করত, মানুষ কেবল রক্ত-মাংসের কোনো শরীর নয়, বরং প্রতিটি মানুষ একে অপরের সাথে যুক্ত একাধিক আত্মিক উপাদান বা আধ্যাত্মিক সত্তার সমন্বয়ে গঠিত।
 
উদাহরন স্বরুপ, কা (Ka) বলতে বোঝানো হতো মানুষের ভেতরের জীবনশক্তি কিংবা তার অবিকল এক আত্মিক প্রতিরূপকে। অন্যদিকে বা (Ba) ছিল মানুষের নিজস্ব ব্যক্তিত্ব আর স্বাতন্ত্র্যের প্রতীক, যাকে মানুষের মাথাওয়ালা এক পাথির অবয়ব হিসেবে কল্পনা করা হত। আর আখ (Akh) ছিল সেই শুদ্ধ, রূপান্তরিত ও পরিপূর্ণ আত্মা, যা মৃত্যুর পর সমস্ত পার্থিব বন্ধন পেরিয়ে দেবতাদের মাঝে অমরত্ব লাভ করার যোগ্যতা অর্জন করত।
 
প্রাচীন মিশরীয়রা মনে করত, মানুষের শরীর থেকে যখন এই আত্মিক উপাদানগুলো আলাদা হয়ে যেত, তখনই মূলত মৃত্যুর ঘটনা ঘটত। তবে তাদের কাছে মৃত্যু মানেই সবকিছুর শেষ বা চিরতরে হারিয়ে যাওয়া ছিল না। তাদের আসল লক্ষ্য ছিল মৃত্যুর পর এই বিচ্ছিন্ন আত্মিক সত্তাগুলোকে আবার একসাথে জুড়ে দেওয়া এবং পরলৌকিক জগতে এক চিরন্তন ও অমর জীবন লাভ করা।  
 
প্রাচীন মিশরীয়রা মানব দেহকে আত্মার এক অনন্য আশ্রয়স্থল বা নোঙর হিসেবে মনে করতো। সুতরাং তাদের কাছে মৃতদেহকে টিকিয়ে রাখা বা সংরক্ষন করা অত্যন্ত জরুরি ছিল। মূলত এই বিশ্বাস থেকেই প্রাচীন মিশরে মমিকরণের প্রথার জন্ম হয়। মৃতদেহকে অত্যন্ত যত্নসহকারে সংরক্ষণ করার মাধ্যমে মিশরীয়রা আশা করত যে মৃত ব্যাক্তির আত্মা যেন অনন্তকালের জন্য তার একটি স্থায়ী ও সুরক্ষিত আবাস খুঁজে পায়।
 
আর এই পুরো জটিল আত্মিক রূপান্তরের (Spiritual Transformation) কঠিন পথটিতে মৃত ব্যাক্তির আত্মাকে পরকালে সঠিক দিকনির্দেসশনা দিতে বুক অব দ্য ডেড একটি পূর্ণাঙ্গ গাইডবুক বা সহায়িকা হিসেবে কাজ করত।  
 

বইটির গঠন এবং বিষয়বস্তু 

বুক অব দ্য ডেড আমাদের চেনা-জানা প্রচলিত কোনো বইয়ের মতো ধারাবাহিক গল্প বা উপাখ্যান নয়। এটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ও স্বতন্ত্র কিছু মন্ত্র, প্রার্থনা এবং পরলৌকিক নির্দেশনার এক চমৎকার সংকলন। আধুনিক গবেষকেরা এই প্রাচীন পাণ্ডুলিপিগুলোতে প্রায় দুই শতাধিক পৃথক মন্ত্র বা স্পেল (Spell) শনাক্ত করেছেন। তবে প্রতিটি অনুলিপিতেই যে এই সবকটি মন্ত্রের দেখা মিলত, এমনটি নয়; প্রয়াত মানুষের পরকালীন প্রয়োজন এবং তাঁর পরিবারের সামর্থ্যের ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন অনুলিপিতে মন্ত্রের সংখ্যা ও তার নির্বাচন বদলে যেত।
 
এই মন্ত্রগুলোকে পরলোকে বিভিন্ন ধরনের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হতো। এর মধ্যে বেশ কিছু মন্ত্রের কাজ ছিল মৃত ব্যক্তিকে ওপার জগতের বিপজ্জনক অতিপ্রাকৃত প্রাণী আর অশুভ শক্তির হাত থেকে বাঁচিয়ে রাখা। আবার কিছু মন্ত্রে গোপন সব নাম ও সংকেতের উল্লেখ থাকত, যা পরকালের বিভিন্ন রহস্যময় দ্বার এবং দুর্গম পথ পাড়ি দেওয়ার জন্য অপরিহার্য ছিল।
 
প্রাচীন মিশরীয়রা বিশ্বাস করত যে এই বইয়ে উল্লেখ করা কিছু বিশেষ মন্ত্র মৃত ব্যাক্তিদের আত্মাকে যেকোনো প্রাণী কিংবা দেবতাদের রূপ ধারণ করার অলৌকিক ক্ষমতা দেয়। এছাড়াও এতে এমন এমন বহু মন্ত্রের সংকলনও এতে ছিল, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল পরলোকের বিভিন্ন দেবী ও দেবতার প্রত্যক্ষ সাহায্য, সুরক্ষা এবং আশীর্বাদ লাভ করা।
 
পরকালে মৃত ব্যাক্তির আত্মার দৈনন্দিন ও ব্যবহারিক প্রয়োজনকে কেন্দ্র করে এই জাদুমন্ত্রগুলোর বড় একটি অংশ তৈরি হয়েছিল। মৃত্যুর পরের জীবনেও মৃত ব্যক্তির খাদ্য, পানি, পোশাক কিংবা শত্রুভাবাপন্ন কোনো সত্তার আকস্মিক আক্রমণ থেকে সুরক্ষার প্রয়োজন হতে পারে; এমন এক বিশ্বাস থেকেই মূলত এই ধারণাগুলোর জন্ম হয়েছিল। আর এই মন্ত্রগুলো নিশ্চিত করত যেন পরকালীন জীবনে এই মৌলিক ও নিত্যদিনের প্রয়োজনীয়তাগুলো তাঁর জন্য সবসময় সহজলভ্য ও সুরক্ষিত থাকে।
 
এই পাণ্ডুলিপিগুলোতে চিত্রায়ণ বা অলংকরণের ভূমিকাও ছিল সমান গুরুত্বপূর্ণ। প্রাচীন মিশরীয় শিল্পীরা পুরো পাণ্ডুলিপিটিকে অত্যন্ত চমৎকার ও রঙিন সব দৃশ্যে ভরিয়ে তুলতেন। সেখানে বিভিন্ন দেবী-দেবতা, অদ্ভুত সব দানব, পরলৌকিক আচার-অনুষ্ঠান এবং মৃত ব্যাক্তির আত্মাকে ওপার জগতের যেই কঠিন পরীক্ষাগুলোর মুখোমুখি হতে হতো; তার চিত্রগুলো নিখুতভাবে ফুটিয়ে তোলা হতো। 
 
প্রাচীন মিশরীয়রা বিশ্বাস করতেন যে এই ছবিগুলোর ভেতরেও এক ধরনের অলৌকিক বা জাদুকরী শক্তি লুকিয়ে রয়েছে। অনেক সময়, এই চিত্রগুলোকে লিখিত জাদুমন্ত্রের মতোই সমান প্রভাবশালী ও গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হতো।
 

পরকালে মৃত ব্যাক্তির আত্মার যাত্রা  

বুক অব দ্য ডেড-এর সবচেয়ে রহস্যময় ও আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি হলো পরকালীন যাত্রার বিস্তারিত বিবরণ। প্রাচীন মিশরীয়দের বিশ্বাস অনুযায়ী, মৃত্যুর পর আত্মা দুয়াত (Duat) নামের এক জগতে প্রবেশ করত, যাকে সাধারণত পাতাললোক বা পরকালের রাজ্য হিসেবে বর্ণনা করা হয়।
 
তবে এই দুয়াত আমাদের চেনা-জানা প্রচলিত কোনো শাস্তির স্থান বা নরক ছিল না; এটি ছিল এক বিশাল ও বৈচিত্র্যময় অতিপ্রাকৃতিক জগৎ। এই রহস্যময় গোলকধাঁধায় যেমন ছিল আদিগন্ত বিস্তৃত নদী, অসংখ্য পাহারাবেষ্টিত দ্বার আর অগ্নিগর্ভ হ্রদ; তেমনই ছিল নানা দেব-দেবী এবং অদ্ভুত সব বিপজ্জনক প্রাণীর আনাগোনা। ওপার জগতের এই জটিল ও বিপদসংকুল পথগুলো এক এক করে অতিক্রম করেই মৃত ব্যাক্তির আত্মাকে তার পরম ও চূড়ান্ত গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যেতে হতো।  
 
দুয়াতের মধ্য দিয়ে যাত্রা করার জন্য অগাধ জ্ঞান আর সুনিপুণ প্রস্তুতির প্রয়োজন ছিল। ওপার জগতের সেই দুর্গম ও গোলকধাঁধাময় পথে মৃত ব্যক্তির আত্মাকে যেসব দ্বাররক্ষক, প্রহরী এবং বিভিন্ন দেব-দেবীর মুখোমুখি হতে হতো, তাদের প্রত্যেকের আসল নাম জানাটা বাধ্যতামূলক ছিল। প্রাচীন মিশরীয় জাদুবিদ্যায় এই বিশ্বাস অত্যন্ত দৃঢ় ছিল যে, কোনো সত্তার গোপন বা প্রকৃত নাম জানা মানেই তার ওপর এক ধরনের অলৌকিক ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। ফলে বুক অব দ্য ডেড-এর অনেক মন্ত্রে প্রয়োজনীয় গোপন নাম, সংকেত এবং রহস্যময় জ্ঞান প্রদান করা হতো, যাতে মৃত ব্যক্তি পরকালের বিভিন্ন বাধা সফলভাবে অতিক্রম করতে পারে।
 
মৃত ব্যাক্তির আত্মার এই যাত্রা নানা বিপদ আর চরম ঝুঁকিতে পরিপূর্ণ ছিল। ওপার জগতের সেই রহস্যময় পথে বিষাক্ত কালসাপ, রক্তপিপাসু দানব এবং অন্যান্য ভয়ংকর অতিপ্রাকৃতিক সত্তাগুলো প্রতিনিয়তই পথিকের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়াত। এই কারণেই বুক অব দ্য ডেড-এর কিছু নির্দিষ্ট মন্ত্র বিশেষভাবে রচনা করা হয়েছিলঃ যাতে করে মৃত ব্যক্তির আত্মা দুয়াতে বা পরকালে শিরশ্ছেদ, অঙ্গচ্ছেদ, পানিতে ডুবে মৃত্যু এবং সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয়, অর্থাৎ চিরতরে আত্মিক বিনাশের (Spiritual Annihilation) মতো চরম বিপদ থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ রক্ষা করতে পারেন।   
 
কিছু কিছু প্রাচীন লেখায় এমন উল্লেখও পাওয়া যায় যে, মৃত ব্যক্তি স্বয়ং সূর্যদেবতার সঙ্গী হয়ে পরলোকের সেই অন্ধকার জগতের বুক চিরে তাঁর নৈশযাত্রায় অংশ নিতেন।  প্রাচীন মিশরীয়দের মনে এক গভীর বিশ্বাস ছিল যে, সূর্য যেমন প্রতিদিন সন্ধ্যায় দিগন্তের ওপারে হারিয়ে গিয়েও পরদিন সকালে এক নতুন শক্তি নিয়ে উদিত হয়, ঠিক তেমনি মানুষের আত্মাও মৃত্যুর পর এক অলৌকিক পুনর্নবীকরণ (renewal) ও পুনর্জন্মের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আবর্তিত হতে পারে। 
 
এই কারণেই প্রাচীন মিশরীয়দের চিরন্তন আকাঙ্ক্ষা ছিল সূর্যের মতোই মৃত্যুকে অবলীলায় জয় করে এক নতুন জীবন লাভ করা এবং অনন্তকাল ধরে মহাবিশ্বে নিজের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখা।  
 

মৃত ব্যাক্তির হৃদয়ের বিচার 

দ্য-ইজিপশিয়ান-বুক-অব-দ্য-ডেডঃ মৃত্যু-পরবর্তী-জীবনের-নির্দেশিকা
প্যাপাইরাস অব হুনেফার -এ চিত্রিত মৃত ব্যাক্তির হৃদয়ের বিচার করার অনুষ্ঠান 

 
বুক অব দ্য ডেড-এর সবচেয়ে সুপরিচিত ও বিখ্যাত অংশ হলো মৃতদের আত্মার বিচার প্রক্রিয়ার সেই রোমাঞ্চকর বিবরণ, যা ইতিহাসে হৃদয়ের বিচার করার অনুষ্ঠান (Weighing of the Heart) নামে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছে। এই নাটকীয় দৃশ্যটি প্রাচীন মিশরের অজস্র পাণ্ডুলিপিতে অত্যন্ত নিখুঁত ও আকর্ষণীয়ভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এবং সময়ের বিবর্তনে এটি প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতার অন্যতম প্রধান আইকনিক প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
 
প্রাচীন মিশরীয়রা বিশ্বাস করত যে, মৃত ব্যাক্তির আত্মা ওপার জগতের সমস্ত জটিল ও বিপদসংকুল পথ পাড়ি দিয়ে শেষ পর্যন্ত এক মহিমান্বিত ঐশ্বরিক বিচারকক্ষে হাজির হতো; যার সভাপতিত্ত্ব করতেন স্বয়ং মৃত্যুর দেবতা ওসাইরিস। সেই পরম বিচারসভায় ব্যক্তির অন্তরের হৃদয় বা ইব-কে দাঁড়িপাল্লার এক পাল্লায় রাখা হতো, আর অন্য পাল্লায় স্থাপন করা হতো দেবী মা’আতের একটি অলৌকিক পালক। এই পবিত্র পালকটি পরম সত্য, নিখাদ ন্যায়বিচার এবং মহাজাগতিক শৃঙ্খলার এক চিরন্তন প্রতীক হিসাবে কাজ করত। 
 
প্রাচীন মিশরীয় চিন্তাধারায় মানুষের হৃদপিণ্ড বা হৃদয়ের একটি অনন্য ও বিশেষ ভূমিকা ছিল। প্রাচীন মিশরীয়রা মানুষের হৃদয় বা ইব-কে বুদ্ধি, স্মৃতি, নৈতিকতা এবং সমস্ত আবেগের আসল উৎস হিসেবে বিবেচনা করত। তাদের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, একজন মানুষ তার জীবদ্দশায় ভালো-মন্দ যা কিছু করে, তার প্রতিটি কাজের রেকর্ড বা দলিল এই হৃদয়ের মধ্যেই চিরতরে সংরক্ষিত হয়ে থাকে।
 
যদি মৃত ব্যাক্তির হৃদয় ইহজগতে ভালো কাজের প্রভাবে দেবী মা’আতের পবিত্র পালকের সঙ্গে নিখুঁতভাবে ভারসাম্য রক্ষা করতে পারত, তাহলে মৃত ব্যক্তির আত্মা পরম ধার্মিক ও শুদ্ধ বলে প্রমাণিত হতো এবং ওসিরিসের আলোকময় রাজ্যে তার চিরন্তন শান্তিময় জীবনে প্রবেশের অধিকার মিলত। কিন্তু যদি অন্যায় কাজ ও পাপের ভারে হৃদয়টি সেই পালকের চেয়ে সামান্যতম ভারী প্রমাণিত হতো, তবে সেই কলঙ্কিত আত্মার জন্য ওপার জগতে এক অবর্ণনীয় ও ভয়াবহ পরিণতি  অপেক্ষা করত।
 
সেই দাঁড়িপাল্লার ঠিক পাশেই আম্মিত নামের এক ভয়ঙ্কর অতিপ্রাকৃতিক সত্তা ওত পেতে অপেক্ষা করত। এই রাক্ষুসে প্রকৃতির জীবটি কুমির, সিংহ এবং জলহস্তীর মতো হিংস্র ও বিশালাকার পশুর শারীরিক বৈশিষ্ট্যের এক অদ্ভুত ও বীভৎস সংমিশ্রণে গঠিত হয়েছিল। ওসিরিসের আদালতে অযোগ্য ও পাপী বলে প্রমাণিত হওয়া ব্যক্তিদের হৃদয়কে নিমেষেই খেয়ে নেওয়াই এর একমাত্র কাজ ছিল।  
 
যাদের কলঙ্কিত হৃদয় এই আম্মিতের পেটে চলে যেত, তারা এমন এক চিরন্তন পরিণতির মুখোমুখি হতো যাকে আধুনিক গবেষকেরা প্রায়শই দ্বিতীয় মৃত্যু (Second Death) বলে আখ্যায়িত করে থাকেন; যার সহজ অর্থ হলো, মহাবিশ্ব থেকে সেই মৃত ব্যাক্তির আত্মার সম্পূর্ণ, চূড়ান্ত ও চিরস্থায়ী বিলুপ্তি ঘটা।  
 
এই ধারণাটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ প্রাচীন মিশরীয় ধর্মে সাধারণত পরকালে আত্মার চিরস্থায়ী শাস্তি বা যন্ত্রণার চেয়ে অস্তিত্বের ধারাবাহিকতার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হত। মহাবিশ্বের বুক থেকে নিজের অস্তিত্বটুকু চিরতরে হারিয়ে ফেলাই (অর্থাৎ সম্পূর্ণ ও চূড়ান্তভাবে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া)  বরং প্রাচীন মিশরীয়দের কাছে সবচেয়ে আতঙ্কের ব্যাপার ছিল। 
 

নেতিবাচক পাপ স্বীকারোক্তি  

পরম বিচারের মূল পর্বটি শুরু হওয়ার ঠিক আগে, ওসিরিসের সেই মহিমান্বিত আদালতে দাঁড়িয়ে মৃত ব্যক্তির আত্মা এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘোষণাপত্র পাঠ করত, যা প্রাচীন মিশরীয় ধর্মীয় বিশ্বাসে নেগেটিভ কনফেশন (Negative Confession) বা নেতিবাচক পাপ স্বীকারোক্তি নামে সুপরিচিত ছিল। এই বিশেষ অনুষ্ঠানে ব্যক্তি তার ইহকালের জীবনে কখনো কোনো পাপ বা অপরাধ করেনি, তা প্রমাণ করতে দীর্ঘ এক তালিকা ধরে নিজের সম্পূর্ণ নির্দোষিতা ও পবিত্রতা ঘোষণা করত।
 
উদাহরণস্বরূপ, সেই ঘোষণাপত্রে অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে এমন কিছু আত্মপক্ষসমর্থনমূলক বক্তব্য অন্তর্ভুক্ত থাকতঃ
  •  আমি চুরি করিনি।
  • আমি কাউকে হত্যা করিনি।
  • আমি কখনো মিথ্যা বলিনি।
  • আমি কোনো মানুষকে কষ্ট দিইনি।
  • আমি অন্যের সঙ্গে কোনো প্রকার প্রতারণা করিনি।
 
এই সুদীর্ঘ ও নিষ্ঠাপূর্ণ জবানবন্দির মাধ্যমে মৃত ব্যক্তির আত্মা মূলত আদালতের সামনে এটিই প্রমাণ করার আপ্রাণ চেষ্টা করত যে, সে তার ইহকালের জীবনে দেবী মা’আতের মহাজাগতিক শৃঙ্খলা ও নৈতিক আদর্শ মেনে এক পরম ন্যায়পরায়ণ জীবনযাপন করেছে; আর তাই ওপার জগতের সেই অনন্ত, শান্তিময় ও আলোকময় জীবনের সে সম্পূর্ণ যোগ্য দাবিদার।  
 
এই ঘোষণাগুলো প্রাচীন মিশরীয়দের নৈতিক মূল্যবোধ ও জীবনদর্শন সম্পর্কে আমাদের অত্যন্ত গভীর ও গুরুত্বপূর্ণ ধারণা প্রদান করে। তাদের সামাজিক কাঠামো ও ধর্মীয় বিশ্বাসে সততা, পরম ন্যায়বিচার, পারস্পরিক সহমর্মিতা এবং সামাজিক সম্প্রীতিকে কতটা সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেওয়া হতো তা এই ঘোষণাগুলো থেকেই স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। জাগতিক নিয়ম ও মহাজাগতিক শৃঙ্খলার মেলবন্ধন ঘটিয়ে তারা এমন এক সমাজ বিনির্মাণের স্বপ্ন দেখত, যেখানে ব্যক্তির প্রতিটি কর্মই ওপার জগতে তার অনন্তকালের নিয়তি নির্ধারণ করত।
 
এই নেগেটিভ কনফেশন বা নেতিবাচক পাপ স্বীকারোক্তি এটিই প্রমাণ করে যে, প্রাচীন মিশরীয় ধর্মবিশ্বাস কেবল জাদুবিদ্যা, মমিফিকেশন কিংবা বাহ্যিক ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের গোলকধাঁধায় সীমাবদ্ধ ছিল না। মৃত্যুর পর ওপার জগতে একজন মানুষের চূড়ান্ত নিয়তি নির্ধারণে তার জাগতিক নৈতিক আচরণ, মানবিকতা ও সদাচার অত্যন্ত বলিষ্ঠ ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। 
 
বিভিন্ন সুরক্ষামূলক মন্ত্র, বুক অব দ্য ডেড-এর পবিত্র জ্ঞান এবং তান্ত্রিক আচারগুলো মৃতব্যক্তির বিচারদিনের কঠিন পথ পার হতে সাহায্য করত। তারপরেও মৃত ব্যাক্তির আত্মার ওসিরিসের আদালতে আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য পৃথিবীর বুকে একটি সৎ, নিষ্কলঙ্ক ও ন্যায়নিষ্ঠ জীবনযাপন করা একেবারেই অপরিহার্য ও বাধ্যতামূলক শর্ত ছিল।  
 
বহু গবেষক ও ইতিহাসবিদের মতে, বুক অব দ্য ডেড -এর নেতিবাচক পাপ স্বীকার করার এই অংশটি  ঐশ্বরিক বিচারের ধারণার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত একটি পূর্ণাঙ্গ নৈতিক বিধির (complete moral code) প্রাচীনতম টিকে থাকা নিদর্শনগুলোর মধ্যে অন্যতম।
 

এই বইয়ে উল্লেখ করা অতিপ্রাকৃতিক সত্তাগুলো  

বুক অব দ্য ডেড পাঠকদের সামনে দেবতা, দেবী এবং অতিপ্রাকৃতিক সত্তাদের এক বিশাল ও রহস্যময় জগতের দ্বার উন্মোচন করে। এর পাতা উল্টালেই ওসাইরিস, আনুবিস কিংবা থোথের মতো প্রধান দেবতাদের দেখা মেলে, যাঁরা মৃত ব্যক্তির আত্মার বিচার ও সুরক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। একই সঙ্গে বইটিতে বর্ণনা করা হয়েছে অসংখ্য ডানাযুক্ত প্রহরী, নরকের অগ্নিকুন্ডের ভয়ঙ্কর রক্ষক এবং অদ্ভুত আকৃতির সব অতিপ্রাকৃতিক সত্তাদের; যাদের সন্তুষ্ট, শান্ত বা পরাস্ত করে তবেই একজন মৃত ব্যাক্তির আত্মাকে পরকালে তার অনন্ত যাত্রায় এগিয়ে যেতে হতো।
 
পরকালের পরম অধিপতি হিসেবে ওসাইরিস মিশরীয় পুরাণের কেন্দ্রীয় স্থানটি অধিকার করে আছেন। প্রাচীন মিশরীয় পৌরাণিক আখ্যান অনুসারে, তিনি তাঁর ঈর্ষাপরায়ণ ভাই সেথ-এর নির্মম ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে নিহত হয়েছিলেন; কিন্তু পরবর্তীতে তাঁর বিশ্বস্ত স্ত্রী আইসিস এবং অনুগত দেবতা আনুবিসের সহায়তায় অলৌকিকভাবে পুনরায় জীবন লাভ করেন। এই অলৌকিক উত্থানের কারণেই ওসাইরিস প্রাচীন মিশরীয়দের কাছে কেবল পরলোকের শেষ বিচারক নন, বরং অনন্ত পুনর্জন্ম, প্রকৃতির নবজীবন এবং আত্মার অমরত্বের এক পরম ও শক্তিশালী মহাজাগতিক প্রতীকে পরিণত হয়েছিলেন। 
 
তাঁর সহধর্মিণী আইসিস প্রাচীন মিশরীয় পুরাণে প্রায়শই একজন পরম রক্ষাকর্ত্রী দেবী হিসেবে আবির্ভূত হন। নিজের অসাধারণ ও অতুলনীয় জাদুকরী ক্ষমতার জন্য তিনি প্রাচীন বিশ্বে সুপরিচিত ছিলেন। ওসাইরিসের  নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর তাঁর খণ্ডিত দেহাবশেষ একত্রিত করে পুনরায় জীবন দান করতে আইসিস প্রধান ও অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। স্বামীর প্রতি এই অবিচল নিষ্ঠা, মাতৃত্বের মহিমা এবং জাদুর দেবী হিসেবে তাঁর এই অনন্য ভূমিকার কারণে তিনি পরবর্তীতে মিশরের ইতিহাসে অন্যতম প্রধান, সবচেয়ে জনপ্রিয় ও প্রিয় দেবীতে পরিণত হন।
 
শেয়ালের মাথাযুক্ত দেবতা আনুবিস মৃত ব্যাক্তিদের আত্মাদের পরকালের অন্ধকার ও রহস্যময় পথে পথপ্রদর্শন করতেন এবং মৃতদেহের মমিকরণের প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত নিপুণতার সঙ্গে তত্ত্বাবধান করতেন।
প্রাচীন মিশরীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, তিনি ছিলেন ওপার জগতের এক অতন্দ্র প্রহরী। তাঁকে প্রায়শই পরকালে মৃত ব্যাক্তির আত্মার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়,হৃদয়ের বিচার করার (Weighing of the Heart) মতো মহাজাগতিক অনুষ্ঠানের প্রধান দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়।
 
আইবিস পাখির মাথাবিশিষ্ট থোথ দেবতাদের প্রধান লিপিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। প্রাচীন মিশরীয় পৌরাণিক বিশ্বাস অনুযায়ী, তিনি ছিলেন জ্ঞান, প্রজ্ঞা, লিপি এবং পবিত্র জাদুর পরম দেবতা। ওসিরিসের আদালতে যখন আনুবিস মৃত ব্যক্তির হৃদয় দাঁড়িপাল্লায় পরিমাপ করতেন, তখন থোথ অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে সেই মহাজাগতিক বিচারকার্যের চূড়ান্ত ফলাফল নথিবদ্ধ করতেন। এর পাশাপাশি, সমস্ত পবিত্র, গোপন ও জাদুকরী জ্ঞান নিখুঁতভাবে সংরক্ষণ করার কারণে বুক অব দ্য ডেড এ তাঁর চরিত্রটিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে দেখানো হয়েছে।
 
এছাড়াও এই গ্রন্থে অসংখ্য অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত দেবতা, রাক্ষস, দানব এবং অতিপ্রাকৃতিক সত্তার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের এই সরব উপস্থিতি মূলত প্রাচীন মিশরীয়দের সেই গভীর বিশ্বাসকেই প্রতিফলিত করে, যেখানে মনে করা হতো যে সমগ্র মহাবিশ্ব এক অদৃশ্য অতিপ্রাকৃত শক্তিতে পরিপূর্ণ এবং এর প্রতিটি কোণ জীবন্ত। এই রহস্যময় পরলোকের প্রতিটি সত্তারই নিজস্ব নির্দিষ্ট দায়িত্ব, বিশেষ অলৌকিক ক্ষমতা এবং সুনির্দিষ্ট কর্তৃত্ব ছিল, যা অনন্ত যাত্রায় এগিয়ে চলা মৃত ব্যক্তির আত্মাকে পদে পদে প্রভাবিত করত। 
 

সত্যিকারের জাদু এবং পবিত্র জ্ঞান  

আধুনিক পাঠকেরা সাধারণত ধর্ম ও জাদুবিদ্যার মধ্যে এক স্পষ্ট বিভাজন রেখা টেনে থাকেন, কিন্তু প্রাচীন মিশরীয়দের মনস্তত্ত্বে ও জীবনদর্শনে এ দুটির মধ্যে অত্যন্ত নিবিড় ও অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক ছিল। 
 
বুক অব দ্য ডেড-এর পাতা উল্টালেই অসংখ্য মন্ত্র, স্তব এবং জাদুবাক্যের দেখা মেলে, যেগুলোকে আজকের বৈজ্ঞানিক বা আধুনিক দৃষ্টিকোণ থেকে অনেকেই হয়তো নিছক জাদুবিদ্যার অংশ বলে মনে করতে পারেন। কিন্তু প্রাচীন মিশরীয়দের কাছে এগুলো সম্পূর্ণ পবিত্র এবং দৈনন্দিন ধর্মীয় আচারেরই একটি বর্ধিত রূপ ছিল।
 
এই অলৌকিক মন্ত্রগুলোর মূল উদ্দেশ্য ছিল পরকালের দুর্গম ও বিপজ্জনক পথে শত্রুর সম্ভাব্য অনিষ্ট ও হিংস্র দানবদের হাত থেকে মৃত ব্যাক্তির আত্মাকে রক্ষা করা, মৃত ব্যক্তির আত্মাকে এক মহিমান্বিত দেবতাসুলভ রূপে রূপান্তরিত করা, এবং ওপার জগতের শক্তিশালী অতিপ্রাকৃতিক সত্তাদেরকে আত্মার সুরক্ষায় এগিয়ে আসতে বাধ্য করা।  
 
প্রাচীন মিশরীয়দের কাছে জ্ঞান কেবল জানার বিষয় ছিল না, বরং জ্ঞান নিজেই ছিল এক অসাধারণ ও অলৌকিক শক্তির উৎস। পরকালের জটিল গোলকধাঁধায় বিভিন্ন সত্তার গোপন নাম মুখস্থ রাখা, সঠিক সুর ও উচ্চারণে পবিত্র মন্ত্র পাঠ করা এবং জটিল প্রতীকগুলোর অন্তর্নিহিত অর্থ অনুধাবন করা, এসবকে কেবল তাত্ত্বিক বিদ্যা মনে করা হতো না; বরং এগুলোকে বাস্তবতাকে সরাসরি প্রভাবিত ও নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতাসম্পন্ন এক পরম হাতিয়ার বলে বিশ্বাস করা হতো। 
 
গোপন ও রহস্যময় জ্ঞানের ওপর এই বিশেষ গুরুত্বই মূলত পরবর্তীকালে এই গ্রন্থটির এক গভীর রহস্যময় খ্যাতি গড়ে তুলতে প্রধান ভূমিকা রেখেছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিভিন্ন গুপ্তবিদ্যা-চর্চাকারী (Occultists) এবং গোপন রহস্যবাদী সংগঠনগুলো বুক অব দ্য ডেড-কে প্রাচীন প্রজ্ঞা, মহাজাগতিক সত্য এবং জাদুকরী গোপন রহস্যের এক পরম ও মূল্যবান ভাণ্ডার হিসেবে বিবেচনা করে এসেছে। 
 
যদিও আধুনিক মিশরতত্ত্ববিদেরা (Egyptologists) সাধারণত বুক অব দ্য ডেড-কে তার বিশুদ্ধ ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় প্রেক্ষাপটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখে ব্যাখ্যা করেন, তবুও এর প্রতীকসমৃদ্ধ গভীর চিত্রকল্প ও রহস্যময় উপস্থাপন আজও বিশ্বজুড়ে নানা ধরনের আধ্যাত্মিক, দার্শনিক ও গুপ্ততাত্ত্বিক (Occult) জল্পনা-কল্পনাকে অনবরত অনুপ্রাণিত করে চলেছে।  
 

এই বইয়ের আবিস্কার এবং আধুনিক যুগে এর প্রভাব  

দ্য-ইজিপশিয়ান-বুক-অব-দ্য-ডেডঃ মৃতু-পরবর্তী-জীবনের-নির্দেশিকা

রোসেটা স্টোন; 

Attribution: Rosetta Stone photograph by Hans Hillewaert, licensed under CC BY-SA 4.0. Source: Wikimedia Commons. Cropped and resized from the original.


 
প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার এবং প্রাচীন মিশরীয় হায়ারোগ্লিফ লিপির ঐতিহাসিক পাঠোদ্ধারের মধ্য দিয়েই মূলত আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে মৃতদের গ্রন্থ বা The Book of the Dead-এর প্রথম সার্থক পরিচয় ঘটে। এই পরিচয়ের ক্ষেত্রে ঊনবিংশ শতাব্দীতে একটি যুগান্তকারী ও গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি সাধিত হয়, যখন বিখ্যাত রোসেটা স্টোন-এর সফল পাঠোদ্ধারের পর পণ্ডিতেরা প্রাচীন মিশরীয় জটিল গ্রন্থগুলো নিখুঁতভাবে অনুবাদ করতে শুরু করেন। 
 
দীর্ঘ বহু শতাব্দীর অন্ধকার অধ্যায় পেরিয়ে এই প্রথম গবেষক ও ইতিহাসের জাদুকরেরা প্রাচীন সমাধি এবং প্যাপিরাস স্ক্রোলে (papyrus scroll) পরম যত্নে সংরক্ষিত রহস্যময় লেখাগুলো সরাসরি পড়তে ও তার অন্তর্নিহিত অর্থ অনুধাবন করতে সক্ষম হন, যা মানব সভ্যতার ইতিহাসের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। 
 
দ্য-ইজিপশিয়ান-বুক-অব-দ্য-ডেডঃ মৃতু-পরবর্তী-জীবনের-নির্দেশিকা
প্যাপিরাস অব আনি; যেখানে বিভিন্ন দেবদেবীরা মৃত ব্যাক্তির (এখানে আনি এবং তার স্ত্রী) হৃদয়ের পরীক্ষা পর্যবেক্ষন করছেন)

 
 
এর অন্যতম প্রধান ও সবচেয়ে বিখ্যাত উদাহরণ হলো প্যাপিরাস অব আনি। খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ১২৫০ অব্দে রচিত এই পাণ্ডুলিপিটি এক অলৌকিক ও অসাধারণ উপায়ে আজ অবধি সুসংরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। এর পাতায় পাতায় আঁকা অত্যন্ত জীবন্ত ও প্রাণবন্ত চিত্রকর্ম এবং বিপুল সংখ্যক জাদুমন্ত্রের সংগ্রহই মূলত বুক অব দ্য ডেড সম্পর্কে আধুনিক বিশ্বকে ধারণা দেওয়ার সবচেয়ে বড় ও নির্ভরযোগ্য উৎসে পরিণত হয়েছে।
 
ইতিহাসের গণ্ডি পেরিয়ে এই প্রাচীন গ্রন্থটি পরবর্তীকালে বৈশ্বিক সাহিত্য, চলচ্চিত্র, দৃশ্যকলা এবং জনপ্রিয় সংস্কৃতির (Pop-culture) ওপর এক গভীর ও স্থায়ী প্রভাব বিস্তার করেছে। পরলোকের শেষ বিচার, অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন জাদুকরী বই, গোপন নামের রহস্যময় শক্তি এবং পাতাললোকের (Underworld) অন্ধকার ও বিপদসংকুল যাত্রার মতো আদিম ও রোমাঞ্চকর বিষয়বস্তুগুলো আজও অসংখ্য আধুনিক কথাসাহিত্য, গল্প এবং চলচ্চিত্রে বারবার নতুন আঙ্গিকে আবর্তিত হয়ে চলেছে।
 
একই সঙ্গে, বুক অব দ্য ডেড একটি অমূল্য ঐতিহাসিক দলিল হিসেবেও অনন্য গুরুত্ব বহন করে। এটি মানবজাতির ইতিহাসের অন্যতম বিস্ময়কর ও রহস্যময় সভ্যতাঃ প্রাচীন মিশরীয়দের সামগ্রিক বিশ্বদৃষ্টি, গভীর জীবনদর্শন, নৈতিক মূল্যবোধ এবং পরকাল-সংক্রান্ত জটিল ধারণা সম্পর্কে আমাদের সরাসরি এক অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করে। 
 
এই গ্রন্থের পাতাগুলো বিশ্লেষণ করলে কেবল তাদের ধর্মীয় আচারই স্পষ্ট হয় না, বরং মৃত্যুর ওপারে এক অনন্ত জীবনের প্রত্যাশায় একটি পুরো জাতি কীভাবে তাদের ইহকালকে পরিচালিত করত, সেই সামাজিক ও মানসিক কাঠামোর এক জীবন্ত চিত্রও আমাদের সামনে উন্মোচিত হয়।
 

শেষ কথা  

সবশেষে বলা যায়, বুক অব দ্য ডেড (The Book of the Dead) মানব ইতিহাসের অন্যতম অসাধারণ ও প্রভাবশালী একটি ধর্মীয় গ্রন্থ, যা জীবন, মৃত্যু, মানবিক নৈতিকতা এবং মহাজাগতিক শৃঙ্খলার (Ma'at) এক গভীর ও বিস্তৃত দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের সামনে তুলে ধরে। এটি কেবল অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার কিছু যান্ত্রিক মন্ত্রের সংকলন নয়; বরং এমন একটি মহান ও দূরদর্শী সভ্যতার আত্মিক পরিচয় তুলে ধরে, যারা মৃত্যুকে জীবনের চূড়ান্ত সমাপ্তি হিসেবে দেখত না।
 
এই বইয়ে উল্লেখ করা পাতাললোকের জীবন্ত বর্ণনা, মৃত ব্যাক্তিদের আত্মার নাটকীয় বিচারদৃশ্য এবং বিভিন্ন দেবতা ও জাদুমন্ত্রের জটিল জগৎ হাজার হাজার বছর পরও বিশ্বজুড়ে পাঠকদের সমানভাবে মুগ্ধ ও কৌতূহলী করে চলেছে। ধর্মীয় শাস্ত্র, অমূল্য ঐতিহাসিক নিদর্শন কিংবা চিরন্তন রহস্যের এক গভীর উৎস; যেভাবেই দেখা হোক না কেন, বুক অব দ্য ডেড মৃত্যু-পরবর্তী অজানা ও রহস্যময় জগতকে অন্বেষণ করার ক্ষেত্রে আজ অবধি মানবজাতির ইতিহাসের অন্যতম আকর্ষণীয় ও শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি হিসেবে অমর হয়ে রয়েছে। 

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

অতিপ্রাকৃতিক ব্লগের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url