বিশ্বের বিভিন্ন সংস্কৃতিতে জাদুবিদ্যা চর্চার একটি সংক্ষিপ্ত বিবরন
যুগের পর যুগ ধরে মানুষ অদেখা শক্তিকে নিজের আয়ত্তে আনতে এবং মহাবিশ্বের লুকানো
রহস্যের অর্থ উদ্ধার করতে চেষ্টা চালিয়ে এসেছে। মহাবিশ্বে নিজেদের অস্তিত্ব ও
অবস্থান বুঝতে চাওয়ার এই গভীর আকাঙ্ক্ষা থেকেই ধর্ম, দর্শন, চিকিৎসাশাস্ত্র ও
প্রতীকের সমন্বয়ে গড়া বিভিন্ন জাদুবিদ্যা বা তান্ত্রিক ঐতিহ্য জন্ম নিয়েছে।
জাদুবিদ্যার বিভিন্ন শাখার ধরন ও লক্ষ্য আলাদা হলেও, এদের মূলে রয়েছে কিছু সাধারণ
বিশ্বাস। যেমনঃ এই মহাবিশ্ব এক অদৃশ্য ও প্রাণবন্ত শক্তিতে পূর্ণ, বিশেষ জ্ঞান বা
আচারের মাধ্যমে মানুষ এই শক্তির সাথে যোগাযোগ করতে পারে এবং প্রতীকী কোনো কাজ
বাস্তবের ঘটনাপ্রবাহকে বদলে দিতে সক্ষম। এই আলোচনায় মূলত শামানবাদ, আনুষ্ঠানিক
জাদুবিদ্যা, প্রাচ্যের গূঢ়তত্ত্ব, লোকজ জাদু এবং আদিবাসী ঐতিহ্যের ওপর আলোকপাত
করা হয়েছে। দৃশ্যমান জগতের সীমানা ছাড়িয়ে মানুষ কীভাবে যুগ যুগ ধরে অর্থ ও
ক্ষমতার সন্ধান করে ফিরছে, সেটিই এই প্রবন্ধে তুলে ধরা হয়েছে।
সূচিপত্রঃ বিশ্বের বিভিন্ন সংস্কৃতিতে জাদুবিদ্যা চর্চার একটি সংক্ষিপ্ত বিবরন
- শামানিক ঐতিহ্যঃ দৃশ্যমান এবং আধ্যাত্মিক জগতের যোগসূত্র
- প্রাচীন মেসোপটেমীয় জাদুবিদ্যাঃ শৃঙ্খলা ও সুরক্ষার আচার-অনুষ্ঠান
- মিশরীয় জাদু (হেকা)ঃ মানুষের হাতে ঐশ্বরিক শক্তি
- গ্রিক ও রোমান জাদুবিদ্যার ঐতিহ্যঃ দর্শন ও মন্ত্রতত্ত্ব
- ইহুদি রহস্যবাদ এবং কাবালিস্টিক জাদুবিদ্যা
- ইসলামী আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যঃ হরফ তত্ত্ব (ইলম আল-হুরুফ) এবং জিন তত্ত্ব
- দক্ষিন এশিয়ায় জাদুর ঐতিহ্যঃ তন্ত্র এবং সিদ্ধি সাধনা
- চীনা জাদুকরী ঐতিহ্যঃ তাওবাদ এবং মহাজাগতিক সম্প্রীতি
- শেষ কথা
শামানিক ঐতিহ্যঃ দৃশ্যমান এবং আধ্যাত্মিক জগতের যোগসূত্র
শামানবাদ
কেবল কোনো ধর্ম বা একক মতবাদ নয়, বরং এটি বিভিন্ন মানব সভ্যতায় চলে আসা অন্যতম এক
প্রাচীন এবং বিস্তৃত আধ্যাত্মিক চর্চা। হাজার হাজার বছর ধরে সাইবেরিয়া থেকে শুরু
করে মধ্য এশিয়া, আমেরিকা, আফ্রিকা এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আদিবাসী সমাজগুলোতে এই
ঐতিহ্য এখনো টিকে আছে।
শামানবাদে বিশ্বাস করা হয়ে থাকে যে আমাদের এই দৃশ্যমান জগতের সমান্তরালে একটি
অদৃশ্য আত্মিক জগত রয়েছে। শামান হলেন সেই ব্যক্তি, যিনি বিশেষ আধ্যাত্মিক শক্তির
মাধ্যমে এই দুই জগতের মধ্যে যাতায়াত করতে পারেন।
শামানিক জাদুবিদ্যার মূল কথা হলো যে বাস্তব জগতটা কেবল আমাদের চোখের সামনে যা
দেখা যায় শুধু তা-ই নয়; এর আড়ালে আরও অনেক অদেখা স্তর রয়েছে। তারা বিশ্বাস করেন
এই রহস্যময় স্তরগুলোতে আমাদের পূর্বপুরুষদের আত্মা এবং শক্তিশালী সব প্রাণসত্তারা
বাস করে, যারা প্রতিনিয়ত মানুষের জীবনের ওপর প্রভাব ফেলে। এই মতবাদ অনুযায়ী,
মানুষের জীবন, স্বাস্থ্য এবং ভাগ্য মূলত এই বিভিন্ন জগতগুলোর মধ্যকার সুসম্পর্ক
বা ভারসাম্যের ওপর নির্ভর করে। অর্থাৎ, জাগতিক ও আধ্যাত্মিক স্তরের মধ্যে
সামঞ্জস্য বজাই থাকলেই মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত হয়।
শামানরা ঢোল বাজিয়ে, মন্ত্র পড়ে, উপবাস থেকে কিংবা
বিশেষ কিছু ভেষজ উদ্ভিদ
ব্যবহারের মাধ্যমে নিজেদেরকে এক ধরনের ঘোরের বা গভীর ধ্যানের অবস্থায় নিয়ে যান।
এই বিশেষ স্তরে পৌঁছানোর মাধ্যমেই তারা সেই রহস্যময় অদেখা জগতে প্রবেশ করতে
পারেন। এই আধ্যাত্মিক ভ্রমণের মূল উদ্দেশ্য হলো এমন সব জ্ঞান, শক্তি এবং
পথনির্দেশ খুঁজে আনা, যা সাধারণ অবস্থায় আমাদের পক্ষে পাওয়া অসম্ভব। এর মাধ্যমে
তারা মানুষের হারানো আত্মা পুনরুদ্ধার করেন, অসুস্থদের সুস্থ করে তোলেন এবং
যাযাবর, আদিবাসী সমাজের লোকেদের সফলভাবে শিকার করা নিশ্চিত করেন। সর্বোপরি, তারা
মানুষ, প্রকৃতি এবং মহাবিশ্বের মধ্যে এক নিবিড় সামঞ্জস্য বজায় রাখতে সাহায্য
করেন।
শামানিক জাদুবিদ্যা কোনো বইপড়া বিদ্যা বা তাত্ত্বিক আলোচনার বিষয় নয়; বরং এটি
শরীর ও মন দিয়ে সরাসরি আধ্যাত্মিক জগতকে অনুভব করার একটি প্রক্রিয়া। এখানে
আধ্যাত্মিক জগতের সাথে ব্যক্তিগত ও সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব
দেওয়া হয়। এই জ্ঞান সাধারণত গুরু-শিষ্য পরম্পরায় মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে।
মজার বিষয় হলো, কেউ চাইলেই হুট করে শামান হতে পারে না। এর জন্য প্রায়ই ব্যাক্তির
কাছে একটি আহ্বান বা ডাক আসে, যা সাধারনত কোনো কঠিন অসুখ, রহস্যময় স্বপ্ন
বা জীবনের বড় কোনো সংকটের মাধ্যমে প্রকাশ পেয়ে থাকে। এই পুরো প্রক্রিয়াটি একজন
মানুষকে আমূল বদলে দেয়। বাস্তব জীবনের কঠিন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে ধৈর্য ধরে দীর্ঘ
সাধনা করেই একজন শামান ধীরে ধীরে তার আধ্যাত্মিক ক্ষমতাগুলো অর্জন
করেন।
প্রাচীন মেসোপটেমীয় জাদুবিদ্যাঃ শৃঙ্খলা ও সুরক্ষার আচার-অনুষ্ঠান
ইতিহাসের পাতায় নথিভুক্ত হওয়া সবচেয়ে পুরনো জাদুকরী রীতিগুলোর একটি হলো প্রাচীন
মেসোপটেমিয়ার (বর্তমানের ইরাক) জাদুবিদ্যা। সুমেরীয়, আক্কাদীয় ও ব্যাবিলনীয়
সভ্যতায় জাদুকে কেবল ভেলকিবাজি মনে করা হতো না; বরং একে মহাবিশ্ব ও সমাজের
শৃঙ্খলা টিকিয়ে রাখার একটি প্রধান শক্তি হিসেবে দেখা হতো।
সেসব সভ্যতার লোকেদের কাছে জাদু ছিল মহাবিশ্ব পরিচালনাকারী ঐশী বা দৈব শক্তির
সাথে যোগাযোগের একটি স্বীকৃত এবং কার্যকর উপায়। তখনকার দিনে এই জাদুবিদ্যা ছিল
তাদের ধর্মীয় আচার, ভাগ্য গণনা ও চিকিৎসাশাস্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এমনকি তাদের
সভ্যতায় চলে আসা বিজ্ঞানের প্রাথমিক ধ্যান-ধারণার সাথেও এটি নিবিড়ভাবে মিশে ছিল।
প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার জাদুবিদ্যার প্রধান লক্ষ্য ছিল মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত
করা। তারা জাদুকে অশুভ আত্মা, রোগবালাই আর দুর্ভাগ্যের হাত থেকে সমাজ ও নিজেকে
বাঁচানোর ঢাল হিসেবে ব্যবহার করত। সেই সময়ের মানুষ বিশ্বাস করত যে, হুট করে আসা
কোনো অসুখ বা বড় কোনো বিপর্যয় আসলে কোনো অশুভ দানবের প্রভাব কিংবা দেবতাদের
অসন্তুষ্টির ফল হিসাবে প্রকাশ পেয়ে থাকে। এই ক্ষতিকর শক্তিগুলোকে নিষ্ক্রিয় করে
দিয়ে জীবনে আবার শান্তি ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনাই প্রাচীন মেসোপটেমীয়ান জাদুবিদ্যার
মূল লক্ষ্য ছিল।
এই ধারার মূল চালিকাশক্তি ছিলেন আশিপু (āšipu) নামে পরিচিত একদল পুরোহিত-জাদুকর।
তাদের প্রধান কাজ ছিল অশুভ আত্মা বা শক্তিকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করা। তারা বিশেষ
মন্ত্র পাঠ, সুশৃঙ্খল আচার-অনুষ্ঠান এবং বিভিন্ন প্রতীকী কাজের মাধ্যমে এসব অশুভ
শক্তির মোকাবিলা করতেন। তাদের এই কাজে কাদামাটির মূর্তি, রক্ষাকবচ বা কবচ এবং
লেখা সম্বলিত মাটির ফলক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। সহজ কথায়, তারা
এসব উপকরণের সাহায্যে একদিকে বিপদকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করতেন, অন্যদিকে সাধারণ
মানুষকে নিরাপত্তা দিতেন।
মেসোপটেমীয় জাদুবিদ্যার অন্যতম প্রধান দিক ছিল এর নিয়ম-কানুন পালনে চরম সতর্কতা
মেনে চলার প্রবনতা। সেখানে বিশ্বাস করা হতো যে, কোনো জাদু তখনই কাজ করবে যখন এর
প্রতিটি ধাপ (অর্থাৎ মন্ত্রোচ্চারণ, হাতের ইশারা বা অঙ্গভঙ্গি এবং উপকরণের নির্বাচন) একদম নিখুঁত হবে। তারা বিশ্বাস করত যে প্রতিষ্ঠিত নিয়ম থেকে চুল পরিমাণ
বিচ্যুতি ঘটলেও পুরো জাদুটি ব্যর্থ হয়ে যাবে। এর কারণ হলো, তারা জাদুকে কোনো
খামখেয়ালি খেলা মনে করত না; বরং একে মহাবিশ্বের এক কঠোর ও অমোঘ নিয়মের অংশ হিসেবে
দেখত। যেখানে নিয়ম ভাঙলে ফলাফল পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মেসোপটেমীয় সভ্যতায় জাদুকে কখনোই দেবতাদের বিরুদ্ধে
বিদ্রোহ বা অবাধ্যতা হিসেবে দেখা হতো না। বরং, এই জাদুকরী আচার অনুষ্ঠান গুলোর
মূল লক্ষ্য ছিল মানুষের কাজকে দেবতাদের ইচ্ছার সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া। যখনই
প্রাকৃতিক বা মহাজাগতিক শক্তির ভারসাম্য নষ্ট হতো, পুরোহিত এবং জাদুকররা এই জাদুর
মাধ্যমেই তা আবার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতেন। অর্থাৎ, জাদুর মাধ্যমে
তারা বিশ্বজগতের নিয়ম ও শান্তি বজায় রাখার একটি সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করতন।
মিশরীয় জাদু (হেকা)ঃ মানুষের হাতে ঐশ্বরিক শক্তি
প্রাচীন মিশরে জাদুবিদ্যাকে হেকা (Heka) বলা হতো। প্রাচীন মিশরীয়দের কাছে জাদু
কেবল কোনো অলৌকিক ক্ষমতা ছিল না, বরং তারা জাদুকে মহাবিশ্বের এক অবিচ্ছেদ্য ও
মৌলিক শক্তি হিসেবে গণ্য করত। তারা বিশ্বাস করত যে দেবতারা এই শক্তি নিজেরা যেমন
ব্যবহার করেন, তেমনি মানুষের ব্যবহারের জন্যও এটি দান করেছেন। হেকার মূল কাজ ছিল
দেবতাদের তৈরি করা মহাজাগতিক নিয়ম বা শৃঙ্খলাকে রক্ষা করা। এই শক্তির মাধ্যমেই
জগতকে বিশৃঙ্খলার হাত থেকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব বলে তারা মনে করত।
প্রাচীন মিশরে জাদুবিদ্যা কেবল কয়েক জন হাতে গোনা লোকেদের চর্চার বিষয় ছিল না,
এটি তাদের সভ্যতায় সাধারন মানুষদের দৈনন্দিন জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল।
রাষ্ট্রীয় বড় বড় অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে রোগ নিরাময় এবং সাধারণ মানুষের
আত্মরক্ষার মন্ত্র, সবকিছুতেই জাদুর এক কেন্দ্রীয় ভূমিকা ছিল।
জাদুর এই প্রভাব কেবল জীবিত অবস্থাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং মৃত্যুর পরবর্তী
যাত্রাতেও হেকা ছিল অপরিহার্য। প্রাচীন মিশরীয়রা বিশ্বাস করত যে
মৃত্যুর পর পরকালে নিরাপদে পৌঁছাতে এবং সেখানে তাদের আত্মার চিরস্থায়ী জীবন
নিশ্চিত করতে এই অতিপ্রাকৃতিক শক্তিই তাদের সবচেয়ে বড় সহায় হিসেবে কাজ করে
থাকে।
মিশরীয় জাদুচর্চায় নাম, ছবি এবং উচ্চারিত শব্দের শক্তির ওপর সবচেয়ে বেশি
গুরুত্ব দেওয়া হতো। তাদের বিশ্বাস ছিল, কোনো দেবতা বা আত্মার আসল নাম যদি কেউ জেনে ফেলে, তবে সে সেই দেবতার ওপর এক ধরনের নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাব
খাটাতে পারে।
প্রাচীন মিশরীয়দের কাছে ভাষা ছিল বাস্তবতাকে বদলে দেওয়ার এক জীবন্ত হাতিয়ার। তারা
মনে করত, সঠিক শব্দ উচ্চারণের মাধ্যমে শূন্য থেকে কোনো কিছু তৈরি করা বা জগতকে
নিজের ইচ্ছেমতো রূপ দেওয়া সম্ভব।
মিশরীয়রা তাদের জাদুকরী মন্ত্রগুলোকে অত্যন্ত যত্নের সাথে বিভিন্ন মাধ্যমে লিখে
রাখত। তারা বিশ্বাস করত যে এই মন্ত্রগুলো সঠিকভাবে লিখে রাখলেই সেগুলোর প্রভাব
বাস্তব জীবনে কাজে আসতে শুরু করবে। মন্ত্রগুলোকে মূলত এই তিনভাবে লিখে রাখা
হতোঃ
- গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রগুলো প্যাপিরাসে (প্রাচীন কাগজ) লিখে রাখা হতো কিংবা সমাধির পাথুরে দেয়ালে খোদাই করে দেওয়া হতো।
- অনেক সময় ছোট ছোট মন্ত্র তাবিজে খোদাই করা হতো।
- এই তাবিজগুলো মানুষ সবসময় সাথে রাখত। এগুলো তাদের কেবল বিপদ-আপদ বা রোগবালাই থেকেই রক্ষা করত না, বরং মহাবিশ্বের ভারসাম্য ও শান্তি বজায় রাখতেও সাহায্য করত।
জাদুচর্চার মাধ্যমে মিশরীয়রা চেয়েছিল তাদের প্রতিদিনের জীবন যেন দেবতাদের তৈরি
করা পবিত্র নিয়ম বা শৃঙ্খলার (যাকে তারা
মা'আত বলত) সাথে তাল মিলিয়ে চলে। এর প্রধান লক্ষ্যই ছিল পার্থিব জীবনকে
স্বর্গীয় ভারসাম্যের সাথে এক করে দেওয়া, যাতে সবকিছু শান্ত আর সুন্দর
থাকে।
গ্রিক ও রোমান জাদুবিদ্যার ঐতিহ্যঃ দর্শন ও মন্ত্রতত্ত্ব
প্রাচীন গ্রিক ও রোমান সভ্যতা কেবল বড় বড় দার্শনিক বা বিজ্ঞানীদের আতুঁড়ঘরই ছিল
না, সেখানে জাদুবিদ্যার এক সমৃদ্ধ ও জটিল জগতের চর্চা বজায় থাকত। মজার ব্যাপার
হলো, এই জাদুচর্চাগুলো কিন্তু সমাজ বা মূলধারার সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো
গোপন বিষয় ছিল না। বরং দর্শন, প্রাথমিক বিজ্ঞান আর ধর্মের মতোই এটি মানুষের
চিন্তা ও বিশ্বাসের সাথে একদম মিশে থাকা একটি বিষয় ছিল।
আমরা যেমন এখন জগতকে বুঝতে বিজ্ঞানের সাহায্য নিই, তারা তখন জগতকে বুঝতে এবং
প্রতিকূল পরিস্থিতিকে নিজের নিয়ন্ত্রণে আনতে জাদুকে একটি শক্তিশালী উপায় হিসেবে
দেখত। বড় বড় দার্শনিক ও পণ্ডিতদের কাছেও জাদুর গুরুত্ব ছিল। তারা মনে করত, পৃথিবী
ও মানুষের মধ্যে যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে, জাদু হলো সেই সম্পর্কেরই একটি ব্যবহারিক
রূপ।
প্রাচীন গ্রিস ও রোমে ধর্মের দুটি আলাদা রূপ ছিল। একদিকে ছিল সমাজের সবার জন্য
উন্মুক্ত রাষ্ট্রীয় ধর্ম, আর অন্যদিকে ছিল মানুষের একান্ত
ব্যক্তিগত জাদুচর্চা। রাষ্ট্রীয় ধর্মের মূল মনোযোগ ছিল বড় বড় উৎসব, নাগরিক
আচার-অনুষ্ঠান এবং দলগত প্রার্থনার ওপর। এর মাধ্যমে পুরো সমাজ বা শহর মিলে
দেবতাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাত। অন্যদিকে, জাদুর জগতটা ছিল একদমই ব্যক্তিগত। যখন
কেউ নিজের জীবনের কোনো সুনির্দিষ্ট সমস্যা বা দুশ্চিন্তা নিয়ে অস্থির থাকত, তখন
সে জাদুর সাহায্য নিত।
প্রাচীন গ্রিক সভ্যতার সময়ের সংকলিত জাদু প্যাপিরাস (The Greek Magical Papyri) থেকে পাওয়া তন্ত্র মন্ত্রগুলো মূলত একটি সমন্বিত বা
সিনক্রেটিক (Syncretic) ব্যবস্থার পরিচয় দেয়, যেখানে মিশরীয় ঐতিহ্য,
নিকটপ্রাচ্যের প্রভাব এবং গ্রিক (Helenistic) উপাদানগুলো মিলেমিশে একাকার হয়ে
গেছে। এই গ্রন্থগুলো আমাদের দেখায় যে, জাদুবিদ্যা কোনো গণ্ডিবদ্ধ বিষয় ছিল না;
বরং তা এক সংস্কৃতি থেকে অন্য সংস্কৃতিতে প্রবাহিত হয়ে নতুন নতুন চিন্তাধারার
সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিয়েছিল। সহজ কথায়, গ্রিক জাদু তৎকালীন সময়ের বিভিন্ন
ধর্মীয় বিশ্বাস এবং মহাজাগতিক দর্শনের এক চমৎকার মিশ্রণ ছিল।
প্রাচীন গ্রিক জাদুচর্চা কেবল অন্ধবিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে ছিল না, বরং এটি ছিল
অত্যন্ত নিয়মতান্ত্রিক এবং প্রায় বৈজ্ঞানিক একটি প্রক্রিয়া। জাদুচর্চাকারীরা
বিশ্বাস করতেন যে, মহাজাগতিক শক্তিকে বশ করতে হলে নির্দিষ্ট কিছু কৌশলী পদক্ষেপ
প্রয়োজন। এজন্যে তারা শুধু মন্ত্র উচ্চারণই করতেন না, বরং গ্রহের অবস্থান অনুযায়ী
সঠিক সময় নির্বাচন করতেন। পাশাপাশি নির্দিষ্ট রত্নপাথর এবং নিখুঁতভাবে আঁকা
আচারচিত্র (Ritual diagrams) ব্যবহার করতেন।
দেবতা, ডেমন বা মহাজাগতিক শক্তিগুলোকে কেবল ভক্তি দিয়ে নয়, বরং একটি বিশেষ
কারিগরি জ্ঞানের (Technical knowledge) মাধ্যমে আহ্বান জানানো হতো। এই প্রক্রিয়ায়
নিয়মনীতির ওপর এতটাই জোর দেওয়া হতো যে, গ্রিক জাদুচর্চা তার সমসাময়িক অন্যান্য
পদ্ধতির চেয়ে অনেক বেশি পদ্ধতিগত এবং অনেকটা আধুনিক বিজ্ঞানের মতো সুশৃঙ্খল হয়ে
উঠেছিল।
প্রাচীন দার্শনিক পিথাগোরাস এবং পরবর্তী সময়ের নব্য-প্লেটোবাদীদের কাছে জাদু কোনো
সস্তা ভেলকিবাজি বা কুসংস্কার ছিল না। তারা জাদুবিদ্যাকে মানুষের আত্মাকে এক
উচ্চতর আধ্যাত্মিক জগতের সঙ্গে যুক্ত করার একটি মাধ্যম হিসেবে দেখে থাকতেন। তাদের
এই চিন্তাধারার মূল বিষয়গুলো দুই ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। এগুলো হলোঃ
- থিউর্জি (Theurgy)ঃ এটি ছিল এক ধরনের দিব্য জাদু। বিভিন্ন পবিত্র আচার-অনুষ্ঠান এবং প্রতীকী কাজের মাধ্যমে এর চর্চা করা হতো। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল মানুষের আত্মাকে কলুষমুক্ত করে এক পরম পবিত্র স্তরে উন্নীত করা।
- জাদুর দার্শনিক রূপঃ তারা জাদুকে প্রায়োগিক অধিবিদ্যা বা ব্যবহারিক দর্শন হিসেবে বিবেচনা করতেন। তাদের মতে, এটি ছিল মহাবিশ্বের গূঢ় সত্যগুলোকে কাজে লাগিয়ে নিজেকে জানার এক আধ্যাত্মিক প্রক্রিয়া।
জাদুর প্রতি প্রাচীন রোমান সমাজের মনোভাব বেশ জটিল এবং প্রায়ই পরস্পরবিরোধী ছিল।
একদিকে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে জাদুর ব্যবহার ছিল চোখে পড়ার মতো। রোগবালাই
থেকে মুক্তি পেতে আরোগ্যদায়ক মন্ত্র কিংবা অশুভ শক্তি থেকে বাঁচতে তাবিজ-কবচের
ওপর তারা ব্যাপকভাবে নির্ভর করত। ব্যক্তিগত সুরক্ষা এবং ঘরোয়া মঙ্গলের জন্য এসব
তুকতাক বা জাদুবিদ্যার চর্চা সে সময় সামাজিকভাবে বেশ গ্রহণযোগ্য ছিল এবং একে
ধর্মেরই একটি অংশ মনে করা হতো।
ব্যক্তিগত জীবনে জাদুর চল থাকলেও, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে রোমানরা একে বেশ সন্দেহের
চোখে দেখত। বিশেষ করে যেসব জাদুবিদ্যা বা গোপন চর্চা রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য
হুমকি হতে পারত কিংবা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করার ক্ষমতা রাখত, সেগুলোকে
কঠোরভাবে দমন করা হতো। ক্ষমতার কেন্দ্রে আঘাত হানতে পারে এমন যেকোনো
রহস্যময় কাজকেই তারা বিপজ্জনক মনে করত।
তবে শত বাধা ও কঠোরতা সত্ত্বেও এই প্রাচীন জাদুপ্রথাগুলো হারিয়ে যায়নি। এগুলো
টিকে ছিল এবং পরবর্তীতে ইউরোপীয় গুপ্ততত্ত্ব বা অতীন্দ্রিয়বাদের (Occultism)
বিকাশে এক গভীর ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলেছিল।
ইহুদি রহস্যবাদ এবং কাবালিস্টিক জাদুবিদ্যা
ইহুদি সমাজ ব্যবস্থায় জাদু কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় ছিল না, বরং তা রাবায়ানিক
পাণ্ডিত্য (Rabbinic Scholarship) ও গভীর ধর্মতত্ত্বের হাত ধরে বিকশিত হয়েছিল। এই
ধারায় হিব্রু বা পবিত্র ভাষা, সংখ্যাতত্ত্ব (Gematria) এবং
সৃষ্টিকর্তার পবিত্র নামসমূহের রহস্যময় শক্তির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া
হতো। তাদের কাছে জাদু ছিল মূলত পবিত্র ধর্মগ্রন্থের ব্যাখ্যা এবং আচার-অনুষ্ঠানের
সাথে জড়িত গভীর জ্ঞানের একটি অংশ। অর্থাৎ, ধর্মীয় পাণ্ডিত্য আর জাদুবিদ্যা সেখানে
একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করত।
বাইবেলের প্রাচীন শিক্ষা এবং পরবর্তী সময়ের রহস্যবাদী (mystic) দর্শনের ওপর
ভিত্তি করে কাব্বালাহ (Kabbalah) একটি অত্যন্ত শক্তিশালী গুপ্ততাত্ত্বিক ধারায় পরিণত হয়। এর মূল লক্ষ্য ছিল
মহাবিশ্বের সৃষ্টির গোপন রহস্য এবং আধ্যাত্মিক বা দিব্য শক্তির প্রবাহ কীভাবে কাজ
করে, তা গভীরভাবে বুঝতে পারার ক্ষমতা অর্জন করা। কাব্বালাহপন্থীরা বিশ্বাস করতেন
যে, যদি কেউ সৃষ্টির এই সূক্ষ্ম কাঠামো সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞান অর্জন করতে পারেন,
তবে তিনি আধ্যাত্মিক শক্তির মাধ্যমে বাস্তব জগতকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা লাভ করেন।
কাব্বালাহ সাধনার মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো
ট্রি অব লাইফ । এটি মূলত সৃষ্টিকর্তার ১০টি বিশেষ গুণের বা ঐশ্বরিক শক্তির একটি প্রতীকী
মানচিত্র, যাকে হিব্রু ভাষায় সেফিরোট (Sefirot) বলা হয়। এই কাঠামোটি
আমাদের শেখায় যে, কীভাবে এক অসীম ও অদৃশ্য পরম সত্তা (সৃষ্টিকর্তা) এবং আমাদের এই
দৃশ্যমান বস্তুগত জগতের মধ্যে একটি গভীর ও গতিশীল সম্পর্ক বিদ্যমান রয়েছে।
সাধকদের বিশ্বাস অনুযায়ী, ট্রি অব লাইফের এই বিশেষ বিন্যাস নিয়ে গভীর ধ্যান বা
সাধনা করলে মহাবিশ্বের গোপন রহস্য এবং অস্তিত্বের মূল কাঠামো সম্পর্কে দিব্যজ্ঞান
অর্জন করা সম্ভব।
কাব্বালাহ -এর চর্চা করা সাধকদের মূল লক্ষ্য হলো ধ্যান, প্রার্থনা এবং নিজেদের
নৈতিক চরিত্রের উন্নয়নের মাধ্যমে আধ্যাত্মিক ও বস্তুগত জগতের মধ্যে একটি নিখুঁত
ভারসাম্য বা সামঞ্জস্য তৈরি করা। তারা বিশ্বাস করেন যে মানুষের প্রতিটি কাজ
সরাসরি সেফিরোট বা মহাজাগতিক শক্তিস্তরের ভারসাম্যকে প্রভাবিত করে। এই
গভীর বিশ্বাসটি মানুষের সাধারণ নৈতিক আচরণকে কেবল ব্যক্তিগত বিষয় নয়, বরং
মহাবিশ্বকে ত্রুটিমুক্ত করার বা মহাজাগতিক সংশোধন (Cosmic
Repair) -এর একটি উপায় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল।
এছাড়াও, কাবালার কিছু ধারায় আধ্যাত্মিক সুরক্ষার জন্য তাবিজ, দেবদূতদের আহ্বান
জানানো এবং বিশেষ সুরক্ষামূলক মন্ত্র ব্যবহারের প্রচলন রয়েছে। এগুলোকে ঐশ্বরিক
শক্তিকে নিজের জীবনে প্রবাহিত করার এবং অশুভ শক্তি থেকে আত্মাকে রক্ষা করার
ব্যবহারিক মাধ্যম হিসেবে দেখা হয়ে থাকে।
কাব্বালাবাদী জাদু কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে এবং একে কখনোই সাধারণ কোনো জাদুর
কৌশল বা হাতসাফাই হিসেবে দেখা হয় না। বরং জাদুর এই ধারায় জাদুকে গভীর শ্রদ্ধা ও
পরম দায়িত্ববোধের সাথে পালন করাকে সাধকদের এক পবিত্র কর্তব্য হিসেবে বিবেচনা করা
হয়ে থাকে। সাধকদের সবসময় সতর্ক করা হয় যে, এই আধ্যাত্মিক শক্তির অপব্যবহার করলে
হিতে বিপরীত হতে পারে। ভুল পদ্ধতিতে বা অসৎ উদ্দেশ্যে এই শক্তি ব্যবহারের চেষ্টা
করলে সাধকের মানসিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়া বা আত্মিক পতনের আশঙ্কা থাকে।
মূলত আধ্যাত্মিক ক্ষতি এবং নৈতিক অবক্ষয় থেকে সাধককে রক্ষা করার জন্যই এই চর্চায়
কঠোর সীমারেখা টেনে দেওয়া হয়। এখানে বিশ্বাস করা হয় যে, পবিত্র জ্ঞান অর্জনের
জন্য কেবল বুদ্ধিবৃত্তিক যোগ্যতা থাকলেই হয় না, বরং সাধকের মনের পবিত্রতা এবং
নৈতিক দৃঢ়তা থাকাও সমান জরুরি। এই জন্যে, ঐতিহাসিকভাবে, কাব্বালার গভীর জ্ঞান
লাভের আগে একজন ব্যক্তিকে সাধারণত বিবাহিত হওয়া, নির্দিষ্ট বয়স (যেমন ৪০ বছর)
অতিক্রম করা এবং ইহুদী ধর্মীয় আইনে অগাধ পাণ্ডিত্য অর্জন করার শর্ত দেওয়া
হতো।
মূলত নৈতিক দায়িত্ববোধের ওপর এই বিশেষ গুরুত্বই ইহুদি জাদুকরী ঐতিহ্যকে অন্যান্য
সাধারণ বা স্বার্থসংশ্লিষ্ট মন্ত্রবিদ্যা থেকে আলাদা করেছে। সাধারণ জাদুবিদ্যায়
অনেক সময় কেবল ব্যক্তিগত লাভ বা কোনো কাজ হাসিল করার ওপর জোর দেওয়া হয়। কিন্তু
কাব্বালাবাদী বা ইহুদি জাদুকরী প্রথায় প্রতিটি কাজের পেছনে
আধ্যাত্মিক পবিত্রতা (Spiritual Purity) এবং
মহাজাগতিক মঙ্গলের (Cosmic Wellbeing) চিন্তা থাকা আবশ্যিক।
ইসলামী আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যঃ হরফ তত্ত্ব (ইলম আল-হুরুফ) এবং জিন তত্ত্ব
ইসলামি সভ্যতার সোনালী সময়ে (786 ~ 1258 খ্রিষ্টাব্দ) এক অত্যন্ত উন্নত ও গভীর
জাদুবিদ্যার ধারা বিকশিত হয়েছিল, যা মূলত কুরআন মাজিদের বিশ্বতত্ত্ব,
জ্যোতিষশাস্ত্র এবং সংখ্যাতত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। এই ধারায় আল্লাহর
পবিত্র নামসমূহ, আরবি বর্ণমালার গোপন শক্তি এবং গ্রহ-নক্ষত্রের বিশেষ অবস্থানের
ওপর গভীর গুরুত্ব দেওয়া হতো। একে নিছক জাদুটোনা না বলে বরং একটি
আধ্যাত্মিক বিজ্ঞান হিসেবে দেখা হতো। এই উচ্চতর এবং জটিল জ্ঞান সাধারণত
সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে ছিল এবং এটি প্রধানত বিজ্ঞ পণ্ডিত ও আধ্যাত্মিক
সাধক বা সুফি মহলের মধ্যেই সংরক্ষিত থাকত।
ইসলামি জাদুবিদ্যার অন্যতম বিস্ময়কর একটি শাখা হলো ইল্ম আল-হুরূফ বা
অক্ষরবিজ্ঞান। এই ধারার মূল বিশ্বাস ছিল যে, আরবি বর্ণমালা কেবল লেখা বা কথা বলার
মাধ্যম নয়, বরং প্রতিটি অক্ষর একেকটি বিশাল মহাজাগতিক শক্তির আধার হিসেবে কাজ
করে। এটি বিশ্বাস করা হতো যে, প্রতিটি অক্ষরের পেছনে একটি নির্দিষ্ট গাণিতিক মান
(যেমনঃ আলিফ (1), বা (2), জিম (3), দাল (4) ইত্যাদি) এবং বিশেষ আধ্যাত্মিক
বা অধিবিদ্যাগত গুণাবলি লুকিয়ে আছে। এই অক্ষর আর সংখ্যার সমন্বয় এক অনন্য প্রতীকী
ভাষা তৈরি করেছিল। সাধকদের মতে, এই ভাষার গূঢ় রহস্য বুঝতে পারলেই মহাবিশ্বের মূল
কাঠামো বা এর সৃষ্টির নকশা অনুধাবন করা সম্ভব।
এই গভীর জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে সাধকেরা বিশেষ ধরনের তাবিজ বা প্রতীকী নকশা তৈরি
করতেন, যাকে আরবিতে ওয়াকফ বা নকশ বলা হয়। এই নকশাগুলো মোটেও
এলোমেলো ছিল না; বরং অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও সুনির্দিষ্ট নিয়ম মেনে সেখানে আরবি অক্ষর,
গাণিতিক সংখ্যা এবং আল্লাহর পবিত্র নামগুলো এমনভাবে সাজানো হতো যাতে একটি
আধ্যাত্মিক শক্তি তৈরি হয়।
উদাহরন হিসেবে বলা যায়, অনেক সময় এক টুকরো পরিস্কার কাগজে ৩x৩ বা ৪x৪ আকারের
বর্গাকার ঘর তৈরি করে তাতে সংখ্যার বিন্যাস করা হতো, যেন যেকোনো দিক থেকে যোগ
করলে যোগফল একই থাকে। আল্লাহর বিশেষ কোনো গুণবাচক নাম (যেমন: আল-হাফিজ বা রক্ষাকারী) এর সংখ্যাগত মান বের করে তা নকশায় ব্যবহার করা হতো। এগুলো তৈরির জন্য বিশেষ
সময় (যেমন চাঁদের হিসাব), সুনির্দিষ্ট কালি এবং পবিত্র মনের প্রয়োজন ছিল।
জিনের ধারণাটি ইসলামি আধ্যাত্মিক সাধনায় একটি বিশেষ স্থান দখল করে আছে। কুরআনের
বর্ণনা অনুযায়ী, জিনেরা হলো আগুনের শিখা থেকে তৈরি করা এক রহস্যময় বুদ্ধিমান
সত্তা। মানুষের মতোই তাদের নিজস্ব স্বাধীন ইচ্ছা রয়েছে; অর্থাৎ তারা ভালো
বা মন্দ যেকোনো পথ বেছে নিতে পারে। বিশ্বাস করা হয় যে, তারা আমাদের এই চিরচেনা
জগতের সমান্তরাল এক অদৃশ্য জগতে বসবাস করে।
আধ্যাত্মিক সাধকেরা অত্যন্ত সাবধানতার সাথে এই সত্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ বা
সম্পর্কের চেষ্টা করতেন। সঠিক জ্ঞান ও আধ্যাত্মিক শক্তি ছাড়া জিনের সঙ্গে
যোগাযোগের চেষ্টা করাকে অত্যন্ত বিপজ্জনক মনে করা হতো। ভুল পদ্ধতিতে এগোলে সাধকের
মানসিক বা শারীরিক ক্ষতির আশঙ্কা থাকত। অনেক ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট দোয়া বা
আমলের মাধ্যমে জিনদের সাহায্য নেওয়ার কথা বলা হলেও, বেশিরভাগ সময়েই সাধকেরা এই
ধরনের যোগাযোগকে সৃষ্টির একটি গোপন শক্তির সঙ্গে নিয়মমাফিক মিথস্ক্রিয়া হিসেবে
গণ্য করতেন।
ইসলামি জাদুবিদ্যার এই ধারার মূল বৈশিষ্ট্য ছিল নৈতিকতা এবং
ঐশ্বরিক অনুমতির ওপর প্রবল বিশ্বাস বজায় রাখা। এখানে জাদুকরী ক্ষমতাকে
কোনো অশুভ শক্তির ওপর জোরজবরদস্তি বা জবরদখল হিসেবে দেখা হতো না। বরং একে আল্লাহর
পক্ষ থেকে দান করা এক বিশেষ ইলম বা জ্ঞান বলে মনে করা হতো। বিশেষ করে সুফি
সাধনার প্রভাবে এই চর্চায় প্রতীকী আচার এবং দার্শনিক অভিজ্ঞতার এক অপূর্ব সমন্বয়
ঘটে। এর ফলে এক পর্যায়ে জাদুবিদ্যা এবং আধ্যাত্মিক ভক্তির (Spirituality) মধ্যকার
পার্থক্য এতটাই কমে যায় যে, এই দুইয়ের মধ্যকার সীমারেখা বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে।
দক্ষিন এশিয়ায় জাদুর ঐতিহ্যঃ তন্ত্র এবং সিদ্ধি সাধনা
দক্ষিণ এশিয়ার জাদুবিদ্যার ঐতিহ্য মূলত হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের হাত ধরে গড়ে
উঠেছে, যার মূল ভিত্তি হলো তন্ত্র সাধনা।বাস্তব জগতকে নিজের নিয়ন্ত্রণে আনার
জন্যে বিভিন্ন কৌশল ব্যবহার করাই তন্ত্র সাধনার মুল উদ্দেশ্য। এখানে সাধনার
মাধ্যমে মনের শান্তি বা মুক্তি খোঁজার পাশাপাশি বাস্তব জীবনের সমস্যা সমাধান এবং
প্রতিকূল পরিস্থিতি পরিবর্তনের কৌশলও শেখানো হয়ে থাকে।
তান্ত্রিক মতবাদে বিশ্বাস করা হয় যে, পুরো মহাবিশ্ব এক বিশাল ও গতিশীল শক্তির
প্রবাহে চলছে। তারা আরও মনে করেন, যা কিছু এই বিশাল মহাবিশ্বে আছে, তার সবকিছুই
ক্ষুদ্র আকারে মানুষের শরীরের ভেতরেও বিদ্যমান। অর্থাৎ, শরীরের শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ
করতে পারলেই মহাবিশ্বের রহস্যময় শক্তিকে বোঝা বা ব্যবহার করা সম্ভব।
তন্ত্র সাধনায় সাধকেরা বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান, মন্ত্র জপ, গভীর ধ্যান এবং শারীরিক
শৃঙ্খলার মাধ্যমে মহাবিশ্বের গুপ্ত শক্তিকে অনুভব করার চেষ্টা করেন। এই সাধনার
মূল কৌশলগুলো হলোঃ
- পবিত্র ধ্বনি (মন্ত্র), হাতের বিশেষ মুদ্রা বা অঙ্গভঙ্গি এবং মনের গহীনে বিশেষ কোনো রূপের কল্পনাকে সাধকের ভেতরের ঘুমন্ত শক্তি জাগিয়ে তোলার উপায় হিসেবে দেখা হয়ে থাকে।
- সাধারণ অনেক দর্শনে শরীর বা ইন্দ্রিয়কে আধ্যাত্মিকতার পথে বাধা মনে করা হলেও, এই বিষয় নিয়ে তন্ত্রের ধারণা সম্পূর্ণ উল্টো। এখানে মনে করা হয়, দেহ এবং পাঁচ ইন্দ্রিয় হলো আধ্যাত্মিক ও জাদুকরী জ্ঞান লাভের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় মাধ্যম।
- তন্ত্র জগতকে অস্বীকার করে না; বরং শরীরকে ব্যবহার করেই পরম সত্য বা অলৌকিক ক্ষমতা অর্জন করতে চায়।
তান্ত্রিকেরা মনে করেন, এই শক্তিগুলো বাইরে থেকে আসে না। এগুলো প্রতিটি মানুষের
মনের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে। সঠিক নিয়ম মেনে সাধনা করলে এই সুপ্ত ক্ষমতাগুলোকে
জাগিয়ে তোলা সম্ভব। এই শক্তিগুলো পাওয়ার জন্য সাধকরা কঠোর শৃঙ্খলা মেনে চলেন।
তারা মূলত মন্ত্র জপ, গভীর ধ্যান, বিশেষ আচার-অনুষ্ঠান এবং যোগ সাধনার মাধ্যমে
নিজেদের মন ও শরীরকে তৈরি করেন।
প্রাচীন তান্ত্রিক এবং যোগশাস্ত্রে অলৌকিক ক্ষমতা বা সিদ্ধি ব্যবহারের
ক্ষেত্রে একটি বিশেষ সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। শাস্ত্র মতে, এসব অলৌকিক ক্ষমতার
মোহে পড়লে মানুষের মধ্যে চরম অহংকার জন্মাতে পারে। এই অহংকার সাধককে তার সঠিক পথ
থেকে সরিয়ে দেয়। তাদের মতে, আধ্যাত্মিক সাধনার মূল লক্ষ্য হলো মুক্তি বা
পরম সত্য লাভ করা। অলৌকিক ক্ষমতাগুলো হলো সেই দীর্ঘ পথের পাশের ছোটখাটো প্রাপ্তি
বা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া মাত্র। অর্থাৎ, গভীর সাধনা করলে এই শক্তিগুলো
এমনিতেই চলে আসে, কিন্তু এগুলো সাধনার মূল গন্তব্য নয়।
তান্ত্রিক সাধনার মূল রহস্য
যন্ত্র (yantras), মন্ত্র (mantras) এবং ধ্যান (meditation) এই তিনটি
বিশেষ মাধ্যমের মধ্যে লুকিয়ে আছে।
- যন্ত্র (পবিত্র নকশা)ঃ তান্ত্রিক ঐতিহ্যে যন্ত্র হলো মহাজাগতিক শক্তির একটি জ্যামিতিক মানচিত্র। সাধনার সময় এটি সাধকের মনোযোগকে একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে ধরে রাখতে সাহায্য করে এবং আচার-অনুষ্ঠানের শক্তিকে সঠিক পথে পরিচালিত করে।
- মন্ত্র (পবিত্র ধ্বনি)ঃ মন্ত্রকে মনে করা হয় খোদ দেবতার শক্তির কম্পন। বিশ্বাস করা হয় যে, বারবার মন্ত্র জপ করার ফলে সাধকের শরীরের ভেতরে থাকা আধ্যাত্মিক শক্তিগুলো জেগে ওঠে।
- ধ্যান (মনের প্রতিচ্ছবি)ঃ সাধক যখন কোনো দেবতার রূপ মনের গহীনে স্পষ্টভাবে কল্পনা করেন, তখন সেটি তার ভেতরের শক্তিকে সক্রিয় করার মাধ্যম হিসেবে কাজ করে।
চীনা জাদুকরী ঐতিহ্যঃ তাওবাদ এবং মহাজাগতিক সম্প্রীতি
মূলত দাওবাদ (Taoism) দর্শনের ওপর ভিত্তি করে চীনা জাদুবিদ্যার মূল ভিত্তি গড়ে উঠেছে। এই দর্শনের
প্রধান উদ্দেশ্য হলো দাও বা মহাবিশ্বের পরম সত্য ও অন্তর্নিহিত নিয়মের
সঙ্গে নিজের জীবনের সামঞ্জস্য (harmony) বজায় রাখা। এই ধারার সাধকদের মতে,
মহাবিশ্বের সবকিছুই এক সূক্ষ্ম শক্তির মাধ্যমে একে অপরের সাথে যুক্ত রয়েছে। এই
জীবনীশক্তিকে বলা হয় চি (Qi), যা আমাদের শরীরে এবং প্রকৃতির প্রতিটি কোণায়
বয়ে চলে।
এই সাধনার মূল উদ্দেশ্য হলো মহাবিশ্বের মূল সুরের সাথে নিজের জীবনকে মিলিয়ে
নেওয়া, যাতে করে সাধকেরা শরীর ও মনে পূর্ণ প্রশান্তি ও শক্তি অর্জন করতে
পারেন। সহজ কথায়, দাওবাদী জাদুবিদ্যা হলো প্রকৃতির লুকানো শক্তির ছন্দ চিনে নিয়ে
তার সাথে তাল মিলিয়ে চলার একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবনপদ্ধতি।
অতিপ্রাকৃতিক শক্তিকে নিজের নিয়ন্ত্রণে আনা নয়; বরং প্রকৃতির চিরন্তন ছন্দ ও
মহাজাগতিক ভারসাম্যের সঙ্গে নিবিড় সামঞ্জস্য স্থাপন করাই দাওবাদী জাদুবিদ্যার মূল
লক্ষ্য। যখনই প্রকৃতি বা মানবজীবনে কোনো অসামঞ্জস্য বা বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়, তখনই
তা দূর করে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান, তাবিজ,
মন্ত্রোচ্চারণ এবং ধ্যানপদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। মূলত, প্রকৃতির অদৃশ্য শক্তির
সঙ্গে কোনো সংঘাত নয়, বরং তার স্বতঃস্ফূর্ত প্রবাহের সঙ্গে মিলেমিশে থাকাই হলো এই
প্রাচীন জাদুবিদ্যার আসল সার্থকতা।
ফেং শুই, জ্যোতিষশাস্ত্র এবং প্রাচীন চীনা চিকিৎসাবিদ্যার মতো বিষয়গুলো মূলত দৈনন্দিন
জীবনে প্রয়োগ করা জাদুবিদ্যারই বিভিন্ন রূপ। মানুষ যখন এই পদ্ধতিগুলো মেনে চলে,
তখন সে আসলে নিজের জীবনযাত্রাকে প্রকৃতির অদৃশ্য শক্তি বা চি-র প্রবাহের
সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার চেষ্টা করে। সহজ কথায়, এই প্রাচীন বিদ্যাগুলো আমাদের
শেখায় কীভাবে ঘরবাড়ির সাজসজ্জা থেকে শুরু করে শরীরের যত্ন; সবকিছুর মাধ্যমে
মহাবিশ্বের স্বাভাবিক নিয়মের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা যায় এবং জীবনে সুখ ও সমৃদ্ধি
আনা যায়।
সবশেষে তাওবাদী জাদুবিদ্যায় ভারসাম্য (balance), স্বাভাবিক প্রবাহ (flow) এবং
নৈতিক সংযম (ethical restraint) এই তিনটি বিষয়কে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়ে
থাকে। এই দর্শনের মূল কথা হলো, জাদুর সার্থকতা কোনো অলৌকিক ক্ষমতার প্রদর্শনীতে
নেই, বরং এর প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো মানুষের জীবনযাত্রা এবং পরিবেশের মধ্যে এক
অপূর্ব ছন্দ ফিরিয়ে আনা। অন্যভাবে বলা যায়, নিজের ভেতর এবং বাইরের পৃথিবীর মধ্যে
গভীর সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠা করাই হলো এই প্রাচীন সাধনার মূল লক্ষ্য।
শেষ কথা
বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা জাদুবিদ্যার বৈচিত্র্যময় ঐতিহ্যগুলো মূলত রহস্য, ক্ষমতা এবং
জীবনের গভীর অর্থ বোঝার প্রতি মানুষের চিরন্তন আকর্ষণের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে থাকে।
এগুলোকে কেবল অতীতের কিছু অযৌক্তিক বিশ্বাস বা কুসংস্কার হিসেবে গণ্য করা ভুল
হবে। বরং এই ধারাগুলো শতাব্দী ধরে বিকশিত হওয়া জটিল মহাজাগতিক চিন্তা, নৈতিক
মূল্যবোধ এবং অভিজ্ঞতালব্ধ গভীর জ্ঞানের প্রতিফলন।
বিভিন্ন সংস্কৃতির জাদুকরী দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, বাস্তবতা কেবল
জড় পদার্থের সমষ্টি নয়; বরং এটি আমাদের ইচ্ছা, পারস্পরিক সম্পর্ক এবং আধ্যাত্মিক
অন্তর্দৃষ্টির মাধ্যমে গড়ে ওঠা এক অর্থপূর্ণ জগত। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের এই
প্রাচীন ঐতিহ্যগুলো অধ্যয়ন করলে আমরা কেবল ভিন্ন ভিন্ন বিশ্বাসকেই জানি না, বরং
জগতকে বোঝার এবং নিজের মতো করে গড়ে তোলার যে চিরন্তন মানবিক আকুলতা, তাকেও
নতুনভাবে উপলব্ধি করতে পারি।









অতিপ্রাকৃতিক ব্লগের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url